ঘোষণা

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট একটি অলাভজনক শ্রম সংস্থা। শ্রম বিষয়ে গবেষণা, চর্চা ও প্রচারের মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা এর প্রাথমিক লক্ষ্য। নয়া উদারবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে শ্রমিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এ ব্যবস্থার ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির’ প্রত্যক্ষ ফল হলো প্রকৃতির ওপরে জবরদখলি, যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষিপ্র ব্যাপ্তি, সম্পদের অসম ভাগাভাগি, বহুজাতিক বাণিজ্য গোষ্ঠীর প্রতাপ, সম্মতি উৎপাদনে গণমাধ্যমের দাপট, সামরিক শক্তির বাণিজ্যিক আধিপত্য, যুদ্ধ ও গোঁড়ামির নির্লজ্জ বিস্তার, পণ্য ও পর্নোর প্রভাব, যথেচ্ছ বেসরকারিকরণ, লাগামহীন করারোপ, এবং সেবাবিমুখ পেটোয়া রাষ্ট্রের বিকাশ। এককথায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষকে বঞ্চিত করে মুষ্টিমেয় ধনীকে আরও সম্পদ অর্জনের সুবিধা করে দেওয়াই হয়েছে নয়া উদারবাদী রাষ্ট্রের প্রধানতম কর্মসূচি। এসব ঘটনা শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মস্থলের নিশ্চয়তাকে যেমন ক্ষুণ্ন করেছে, তেমনি তার সার্বিক অস্তিত্বকে ঠেলে দিয়েছে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তায়। উৎপাদন ব্যবস্থার শোষণ-শাসনে পিষ্ট শ্রমিকেরা সংঘবদ্ধ হওয়ার বদলে দলছুট হয়ে পড়েছে খুব সহজেই। যার অব্যবহিত ফল হলো ব্যক্তির নির্লিপ্ততা, আবেগগত নিরাসক্ততা, সংবেদনহীনতা, এবং বিচ্ছিন্নতা। শারীরিকভাবে অপুষ্ট শ্রমিকেরা এখন মানসিক যাতনার বিষেও জর্জরিত। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার ডামাডোলের তুলনায় শ্রমিকদের আর্তনাদ আজ বেশ ক্ষীণ।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ নয়া উদারবাদী ব্যবস্থায় খুব ভালোভাবে সংহত হয়েছে। এতে সরকার, উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের জন্য তৈরি হয়েছে বহু নতুন প্রতিবন্ধকতা। দেশের অনিয়ন্ত্রিত খাত এখন নিয়ন্ত্রিত খাতের চেয়ে বহুগুণে বড়। অর্থাৎ বেচাবিক্রি বাড়লেও সেসব থেকে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। আমদানি পণ্যের ওপরে নির্ভরশীল অর্থনীতি বিপুল বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগকে সংকুচিত করার পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও কৃষির বিকাশকে করেছে রুদ্ধ। অর্থব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার সুযোগে অনিয়ন্ত্রিত খাত বেড়েই চলেছ। এ খাতের উদ্যোক্তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু কর দিচ্ছে না, শ্রমিকদের হকও আদায় করছে না। নিয়োজক বা সরকার কেউই এ খাতের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবনমানের নিশ্চয়তা দিতে সম্মত হয়নি। অথচ অনিয়ন্ত্রিত খাতে নিযুক্ত আছে দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ শ্রমিক। এরা সংখ্যায় প্রায় ছয় কোটি। বিদ্যমান শ্রম আইনের কোনো সুরক্ষা এরা পায় না। নিজেরা সংঘবদ্ধ না থাকায়, আধিকার আদায়েও সমর্থ হয় না তারা।

নিয়ন্ত্রিত খাতের প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিকের [মোট শ্রমিকের প্রায় ১১ শতাংশ] অবস্থা অনিয়ন্ত্রিতখাতে নিযুক্ত শ্রমিকদের চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়। এদের দুই তৃতীয়াংশই কাজ করে বস্ত্র ও খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে। মজুরি, কর্মঘণ্টা, ইউনিয়নের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সবার জন্য প্রযোজ্য একটি শ্রম আইনের দাবিতে নিরন্তর আন্দোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে এসব শ্রমিককে। অথচ তারা সুসংগঠিত নয়। পুরো নিয়ন্ত্রিত খাতের এক শতাংশেরও কম শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত। যদিও অনিয়ন্ত্রিতখাতের শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়নভুক্তির এ হার বহুগুণে কম।

প্রচলিত শ্রম আইন নিয়ন্ত্রিত খাতের শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার দিলেও অনিয়ন্ত্রিতখাতের শ্রমিকদের দেয় না। ইউনিয়ন ও দরকষাকষির আইনগত অধিকার না থাকায়, অনিয়ন্ত্রিত খাতে শ্রমিকদের হরদম বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতে আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকলেও, শ্রমিক আন্দোলন দমনে শিল্প পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়েছে। নানা অদলবদল ঘটছে শ্রম আইন ও শিল্প সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় নীতিগুলোতেও। এগুলো শ্রমিকদের সুরক্ষা ও অধিকারকে সংহত করার বদলে বঞ্চিত করছে।

এসব সমস্যা ছাড়াও শ্রমিক আন্দোলন অনেক নতুন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন: ইউনিয়ন ও সংগঠনে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া, দরকষাকষির দক্ষতা হ্রাস পাওয়া, ইউনিয়ন চালু করতে গিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়া, শ্রমিক সংগঠনগুলোর অন্তর্কলহ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ইউনিয়নকর্মীদের ওপরে স্থানীয় গুণ্ডাদের অত্যাচার, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, লিঙ্গ বৈষম্য, যৌনপীড়ন, নেতৃত্বদানে সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। শ্রমিকদের একটি বড় অংশ, বিশেষত নারী ও শিশুরা, কর্মস্থলসহ সমাজের সর্বত্র নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আইনি, মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে এবং সামাজিক স্বার্থ বিষয়ে ভ্রান্ত সচেতনতা [যেমন: গোষ্ঠীবাদ (বাঙালি-বিহারি), আঞ্চলিকতাবাদ (নোয়াখাইল্যা-সিলোটি) ইত্যাদি] কাজ করায়, শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অবর্ণনীয় অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। শ্রমিকদের ঐক্য ও যুথবদ্ধ আন্দোলনের পথে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের রাজনৈতিক জ্ঞানের অভাব এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যকার বিরোধ।

নয়া উদারবাদের দেখানো স্বপ্নে বিভোর হয়ে শ্রমিকদের বিরাট একটি অংশ আজ নিজেদের সত্তা ও বাস্তব অবস্থাকে ভুলতে বসেছে। বহু শ্রমিক (বিশেষত মানসিক শ্রমিকেরা) সর্বত্র নিজেকে ‘শ্রমিক’ হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে। দেখা গেছে এসব শ্রমিক নিজেদের পেশাজীবী হিসেবে পরিচয় দিতে অস্বস্তি বোধ করে এবং ইউনিয়ন গড়ে তোলার বদলে সভা-সমিতি গড়ে তুলতে বেশি আগ্রহী থাকে। আত্মপরিচয়ের এই সংকটের কারণে শ্রমিক ঐক্য যেমন গড়ে ওঠেনি, তেমনি সম্ভব হয়নি শ্রমিকদের মানবিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিদাওয়া আদায় করা।

নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার তীব্র আঘাতের মুখেও শ্রমিক আন্দোলনে এত দ্বিধা, মতাদর্শিক বিরোধ ও আন্তসংঘাত টিকে থাকার অনেকগুলো কারণ আছে। স্বাধীনতার আগে দীর্ঘ উপনিবেশ কালে, শ্রমিক আন্দোলনে দাবিদাওয়া আদায়ের চেয়ে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম চালানোই ছিল মুখ্য বিষয়। দখলদার মুঘল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণে এদেশীয় শিল্প যেমন বিকাশের বদলে ধ্বংস হয়েছে, তেমনি শ্রমিকদের মানবিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিও থেকেছে চূড়ান্ত অবহেলিত। মাঝে মাঝে অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া আদায়ে শ্রমিকেরা সোচ্চার হয়ে উঠলেও স্বাধীনতার দাবিই শেষ পর্যন্ত প্রধান দাবি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে মতাদর্শিক তর্ক ও চর্চা চালিয়ে একটি উপসংহারে পৌঁছানোর অবকাশও খুব বেশি হয়নি।

স্বাধীনতার পর থেকে শাসকশ্রেণি শিক্ষাব্যবস্থা, উৎপাদন কাঠামো ও সম্পত্তি-বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রমিক সমাজকে এমনভাবে কোণঠাসা ও বিভক্ত করেছে যে শ্রমিকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে হতাশা ও বিভ্রান্তি। শ্রমিকদের মূল স্বার্থ যে এক ও অখণ্ড এবং সবার সত্যিকার সংকট যে অভিন্ন, সে বোধ হারিয়ে ফেলেছে শ্রমিকেরা। পরিণামে আত্মকেন্দ্রিকতা, আঞ্চলিকতা, কুসংস্কার, হতাশা, অনৈক্য ও দুর্বলতা গ্রাস করেছে তাদের। শ্রমিকেরা যাতে একতা, সংগ্রামশীলতা, জ্ঞান, সমঝোতা, সংবেদনশীলতা, সততা, মানবিকতা, হিতাকা্ঙ্ক্ষা ও সৃষ্টিশীলতার চর্চা করতে না পারে, শাসকশ্রেণি সে বন্দোবস্ত করেছে খুব ভালোভাবে। দারিদ্র্য-অসাম্য টিকিয়ে রেখে, দমন-পীড়নের নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে, শিক্ষাকে দুর্মূল্য পণ্য বানিয়ে এবং নাটক-চলচ্চিত্র-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শ্রমিকদের অলীক স্বপ্নে বিভোর করে এবং সামন্তীয় সংস্কৃতিকে লালনের মাধ্যমে শাসকেরা শ্রমিকদের বিভ্রান্ত, নীতিভ্রষ্ট ও দুর্নীতিপরায়ন করে তুলতে পেরেছে। ক্রমে বেশির ভাগ ইউনিয়ন ও ফেডারেশন হয়ে পড়েছে নিষ্ক্রিয়, অগণতান্ত্রিক ও শ্রমিক-স্বার্থবিরোধী। জোরদার ও নিয়মিত আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠেনি, সংহত হয়নি শ্রেণি চেতনাও।

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট মনে করে, শ্রেণি ঐক্য গড়ে ওঠা একটি সচেতন প্রক্রিয়া। এটি আপনা-আপনি ঘটে না। একজন শ্রমিক নিজ স্বার্থের ব্যাপারে আপনা-আপনি সজাগ হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু শ্রেণি-স্বার্থের অনুভূতি তৈরি ও তার জন্য গরজ বোধ করার বিষয়টি একেবারে সচেতন প্রক্রিয়া। এ জন্য ঐক্যের অনুভূতিকে লালন ও শিক্ষাকে সঞ্চারিত করার প্রয়োজন হয়। এ কাজ প্রায় সব সমাজেই সম্পন্ন হয় ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা এবং আন্দোলন সংগঠিত করার মাধ্যমে।

শ্রমিক আন্দোলনের জন্য নতুন কৌশল ও নীতি নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি। নেতাদের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং শ্রমিক আন্দোলনে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ জন্য ট্রেড ইউনিয়ন, শিল্প ইউনিয়ন, পেশাভিত্তিক ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে চিন্তা ও কাজের এক নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এ ছাড়া শ্রমজীবী মানুষদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত করে তোলা দরকার, যাতে তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গঠনে প্রভাব রাখতে পারে। তবে তার প্রাথমিক শর্ত হলো, ঐক্য। কারণ, সংগঠিত মানুষই ইতিহাসের নির্মাতা।

তাই জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ, বয়স, জাতীয়তা ও আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে শ্রমিকদের ঐক্য চায় বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট। শ্রেণি সংগ্রামের পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়ে, সর্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলার সংগ্রামে এ ইনস্টিটিউট অবিচল।