জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আলোচনার সারসংক্ষেপ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৬ জুন ২০১৬ | ০৪:৩৯
বাশির আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তা ও শ্রোতারা। ছবি: বাশি

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) গত ১৫ এপ্রিল ২০১৬, শুক্রবার, “জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সমস্যা” শীর্ষক এক আলোচনা ও মতবিনিময় সভা আয়োজন করে।

ঢাকার মনি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট ভবনের মনির-আজাদ সেমিনার কক্ষে আয়োজিত সভায় বক্তারা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন এবং তা পেরিয়ে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ ও পরিকল্পনা বাতলান।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাশি ট্রাস্টি বোর্ড ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি শাহ্ আতিউল ইসলাম এবং মূল প্রবন্ধ পেশ করেন বাশির ট্রাস্টি বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ গোলাম মুর্শেদ। সভা সঞ্চালনা করেন চলচ্চিত্র পরিচালক ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ফৌজিয়া খান।

আলোচনার সংক্ষিপ্তসার এখানে দেওয়া হলো:

 

শাহ্ আতিউল ইসলাম

সভাপতি, বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) অছি পরিষদ এবং সভাপতি, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন

 

গত কয়েক দশকে শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে বিভিন্ন খাতের মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন শিল্পখাত ও শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইন এবং তার বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন আইনের অধীনে গঠিত জাতীয় নিম্নতম মজুরি বোর্ড এখন পর্যন্ত মোট ৪২টি খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ বা পুনর্ণিধারণ করেছে। এসব কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে এমনটা আপাতভাবে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের মজুরি কমেছে। অর্থাৎ মুদ্রা মজুরি বাড়লেও বাড়েনি প্রকৃত মজুরি। ফলে শ্রমিকদের কেনার ক্ষমতা কমে গেছে। আগে তারা ২৫ টাকায় এক হালি ডিম কিনতে পারলেও এখন ডিম কিনতে ৩২-৩৩ টাকা খরচ হচ্ছে। বেশি টাকা দিচ্ছে, অথচ সেই আগের চারটি ডিমই সে পাচ্ছে।

শ্রমিক আন্দোলনে মজুরি বিষয়টি আরো পরিষ্কার বা পরিচিত হওয়া দরকার। মালিকেরা তাদের মুনাফা থেকে মজুরি দেয় বা মালিকদের দেবার ইচ্ছা বা ক্ষমতার ওপরে মজুরির পরিমাণ নির্ভর করে — এমন ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। এজন্য ইউনিয়ন ও ফেডারেশনগুলোকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। পণ্যে মূল কিভাবে সৃষ্টি হয়, শ্রমশক্তি কিভাবে মূল্য সৃষ্টি সঙ্গে যুক্ত, বাড়তি মূল্য ইত্যাদি বিষয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, বেঁচে থাকার মতো মজুরি, প্রকৃত মজুরি ইত্যাদি সম্পর্কে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বের দাবিদার সংগঠন ও ইউনিয়নগুলোর পরিষ্কার ধারণা এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার ফলে শ্রমিকদের মজুরি ঠিক কতটুকু বাড়ানো দরকার, তা তারা ঠিক বুঝতে পারছে না। মজুরিকে কেবল টাকার অংকে না বুঝে এটাকে এক স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে পেরে সেটি পরিচালনার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা দাঁড় করানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত সমাধান।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি ও বিকাশের সাথে জড়িত। শ্রমিকদের রোজগার না বাড়লে দেশের মানুষের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক দিকগুলোর উন্নতি হবে না। আর তা না হলে বাড়বে না শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বা উৎপাদনের ক্ষমতা। শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে, দেশের রাজস্ব বা বাণিজ্যের প্রসারও ঘটবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকার, রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে বিবেচনা করতে হবে।

খাতওয়ারি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হচ্ছে, সেটা বেশ ভালো ব্যাপার। কিন্তু আমরা মনে করি, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে, সেটার ভিত্তিতে বাকিসব খাতের মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য একটা আইনি কাঠামো প্রয়োজন। এজন্য শ্রম আইন সংস্কার করতে হবে। এটি কেবল ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প খাতের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য। অথচ শিল্প শ্রমিকদের সংখ্যা দেশের মোট শ্রমশক্তির এক পঞ্চমাংশেরও কম। আবার এখনকার শ্রম আইনে জাতীয় ন্যূনতম মজুরির জন্য কোনো বিধানও নেই। তাই এ আইন অবিলম্বে বদলাতে হবে।

এজন্য সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী শ্রমিকসহ সব জনগণের জীবনরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারেই। আমরা মালিকদের অধীনে কাজ করি বলে তারা সেধে সেধে আমাদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি করে দেবে, তা ভাবার বা আশা করার কোনো কারণ নেই। শ্রমিকদের দেখার দায়িত্ব সরকারের। তাকেই উদ্যোগী হতে হবে।

সরকারকে এ কাজে বাধ্য করতে হলে ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, শ্রমিক সংগঠন ও আগ্রহী ব্যক্তিবর্গকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিক শ্রেণী ও শোষিত জনগণের এই মুহূর্তের কাজ হচ্ছে বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী একটি বাঁচার মতো মজুরির জন্য সংগ্রাম করা এবং ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মঘট এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আন্দোলন করা। এই দাবিগুলো আদায়ের জন্য সব দল ও মতের শ্রমিক-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ করা প্রয়োজন। কারণ এই দাবিগুলি কোন একটি শিল্প বা কারখানার দাবি নয়, এ সমস্ত শ্রমিক শ্রেণীর দাবি, তাই সবার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া এই দাবি আদায় করা সম্ভব নয়।

আনু মুহাম্মদ

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি

জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবি তোলার সময় এসে গেছে। এখন পার্মানেন্টলি রেজিস্টার্ড শ্রমিকের সংখ্যা গ্লোবালি কমে আসছে। চুক্তিভিত্তিক, পার্টটাইম শ্রমিক বাড়ছে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত খাতের চেয়ে অনিয়ন্ত্রিত খাতে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। আরও ভালোভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশে স্ব-নিয়োজিত কাজে শ্রমজীবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শ্রমিক আন্দোলন নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। শ্রমিকেরাও আন্দোলন করছে। এসবের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীব্যাপী ক্যাম্পেইন এগেনস্ট ওয়ার্কার শুরু হয়েছে।

ডা. সইফ উদ দাহার জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বিষয়টি নিয়ে এদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। আন্দোলনও করেছেন। তিনি এ দাবিটিকে শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কেবল টাকার অংকে মজুরি বৃদ্ধি নয়, শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরির অবস্থা কি হচ্ছে, সেটি দেখতে হবে। তিনি ১৯৮৭-১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিষয়টিকে যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তাকে ভিত্তি ধরে আমি একটা হিসাব যদি করি - এখন মানুষের আয় মাথাপিছু অনেক বেড়েছে, কিন্তু [প্রকৃত] মজুরি সেভাবে বাড়েনি। ডাক্তার দা [সইফ উদ দাহার] একটা হিসাব করেছেন, জাতীয় আয়ে শ্রমিকের অংশীদারিত্ব কত সে বিষয়ে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ৪০ শতাংশের মতো, ১৯৮৭-৮৮ সালে ২৭-২৮ শতাংশ, ১৯৯০-এর দিকে ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমিকেরা যে পরিমাণ উৎপাদন করছে, সে অনুযায়ী তার বেতন বাড়ছে না। গার্মেন্টস শিল্পের ওপর নানা কারণে একটা দৃষ্টি আছে। কিন্তু জুতা, চামড়া ইত্যাদি আরও নানা খাত আছে। সবদিক হিসাব করে দেখা যায়, এটি এখন ২০ শতাংশের বেশি না।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ব্যবস্থার জন্য বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশে ফরমালের চেয়ে ইনফরমাল খাতে শ্রমিক বেশি। আছে স্ব-নিয়োজিত শ্রমিক, তারপর আরেকটা বড় ডাইমেনশন প্রবাসী শ্রমিক। রিকশাচালক স্ব-নিয়োজিত শ্রমিক। ট্রেড ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিকের ৭ শতাংশের মতো। কিন্তু ইউনিয়নগুলোকে নিয়েও প্রশ্ন আছে যে, তারা কতটা শ্রমিকের স্বার্থে কাজ করে।

মজুরি বাস্তবায়নে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো মালিকেরা। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি মালিকদের জন্য একটা ভীতিকর বিষয়। এ নিয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় ভয়টা আরও বেশি। তারা মনে করে, এটা হলেই মজুরি বাড়াতে হবে। কিন্তু সবসময় তা নাও হতে পারে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি মানে হলো শ্রমিকদের অ্যানিম্যাল পভার্টি লাইন বা কেবল প্রাণধারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি মজুরি দিয়ে, তাদের একটি মানবিক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা।

গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে আন্দোলনের পর। ১৯৯২ সালে যখন সরকারি উদ্যোগে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঠিক হয়, তখন তার জন্য কতগুলো সূচক ঠিক করা হয়। যদিও সে সময় ন্যূনতম মজুরি চূড়ান্ত করা যায়নি। সরকার ও মালিক পক্ষের অনীহার কারণে বিষয়টি আটকে যায়। সেখানে সরকার বা মালিক কী দিতে চায় সেটা আসে। কিন্তু তাদের পরিষ্কার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে তথ্য-উপাত্ত বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে, একজন শ্রমিক যে পরিবারের একক আয়কারী, তা নয়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ‘লিভিং ওয়েজ’ কথাটা এসেছে বুর্জোয়া ইকোনমি যখন প্রথম আসে তখন থেকেই। ন্যূনতম মজুরি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ড. শামসুল আলমের সঙ্গে তর্ক হচ্ছিল। আমি বললাম, কোনোভাবেই একজনের ১৬ হাজারের কমে হয় না। কিন্তু উনি বললেন আমার কথাটা অ্যাবসার্ড, ওনার মতে ১৬০০ টাকা! এরকম মতভেদ নিরসনে তথ্য-উপাত্ত দরকার।

এখন এখানে আমাদের তথ্যসূত্র কী হবে? বিবিএস [বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো] যে তথ্য দেয়, তাতে মেথডলজিগত সমস্যা একটা বড় সমস্যা। আরও নানা সমস্যা আছে। এসবের কারণে একটা পর্যায় পর্যন্ত হিসাব পাওয়া যায়, তারপর আর পাওয়া যায় না। তারপরও বিবিএসের বিকল্প নেই। এর ডেটা নিতে হবে, কিন্তু ক্রিটিকালি অ্যানালাইসিস করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য পরিসংখ্যান দরকার। কিন্তু বিবিএস যেহেতু স্বাধীন সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে পারেনি ম্যানিপুলেশনের শিকার হয়েছে, সেটি ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি। ফলে তাদের ডাটা আমরা নেব কিন্তু তা কনসিসটেন্ট কিনা, নির্ভরযোগ্য কিনা তা পর্যালোচনা করার ক্ষমতা আমাদের থাকতে হবে।

২০০৫ থেকে ২০১০ সালের ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের হিসাব করে সরকার। এ থেকে যে ন্যূনতম আয়ের কথা বলা হয়, তা নিতান্তই কম। কী করে একটা দেশের ন্যূনতম মজুরি দারিদ্র্যসীমার নিচে হয়? সেক্ষেত্রে পরিবারের একাধিক সদস্যকে কাজ করতে হবে এবং ওভারটাইম করতে হবে। এসব তো মানবিক নয়। মূল কথা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি দারিদ্র্যসীমার আয়ের থেকে অবশ্যই বেশি হতে হবে।

যূথবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন কি সম্ভব? আমি বলি সম্ভব। সেটা যদি একমত হওয়া যায়, তা নিয়ে যুগপৎ শ্রমিক আন্দোলন হওয়া উচিত। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে একমত হওয়া মোটেই শক্ত ব্যাপার নয়। তারা চাইলেই তা সম্ভব। কিন্তু এরপরও কেন তা হচ্ছে না, তা ভেবে দেখা দরকার। সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কর্মশালা হতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।

 

ইকতেদার আহমেদ

সাবেক সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় নিম্নতম মজুরি বোর্ড

এখন যে শ্রম আইন আছে তা ২০০৬ সালের। এতে কেবল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন শিল্পখাতকে ন্যূনতম মজুরির আওতায় আনা হয়। অথচ বহুখাত বাদ পড়ে যায়। যেমন: ব্রিকফিল্ড। যেহেতু তা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত খাত নয়, তাই এতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এসবের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী আদেশের বলে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড বা কমিশন গঠন করে দেওয়া যেতে পারে। সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এমনটা হয়ে থাকে।

জাতীয় নিম্নতম মজুরি বোর্ড ছয় সদস্য বিশিষ্ট। মালিক পক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধি, শ্রমিক পক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধি ও অন্য চারজন নিয়ে গঠিত হয় বোর্ড। মালিক পক্ষ খুব শক্তিশালী। অধিকাংশ সময় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়ে থাকে।

বিশ্বব্যাপী মুনাফার ৮০:২০ এই অনুপাতে শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজিত হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সর্বশেষ যে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠনের আইন করা হয়েছে, সেখানে গার্মেন্টস খাতকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত গড় জাতীয় আয়ের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে এখন গড় জাতীয় আয় প্রায় ১০৪৫ ডলার, সে হিসাবে মাসিক ন্যূনতম মজুরি সাত হাজার টাকার কম হওয়া ঠিক নয়। এজন্য সরকারের একটা নীতি প্রণয়ন করা দরকার।

মজুরি বোর্ডে যখন মজুরি নির্ধারণের জন্য দরকষাকষি হয়, তখন শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা দরকার। বোর্ডে যেহেতু শ্রমিক-মালিকদের বাইরের সদস্যরাও থাকে, তাই তাদের সাথেও শ্রমিকদের আলোচনা হওয়া দরকার।

 

চৌধুরী আশিকুল আলম

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন

আমাদের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি করতে হলে আইন প্রণয়ন করতে হবে। মান্নান সাহেব [আবদুল মান্নান ভুঁইয়া] শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে সরকারের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের একবার এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সে সময় এ প্রসঙ্গ উঠে আসে যে, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি করতে হলে তো আগে আইন করতে হবে। সেটা সরকার করলে, তখন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হিসাবে একটা অংক ঘোষিত হলো। অথচ শেষ পর্যন্ত তা পাশ হলো না। কারণ হাইকোর্টে গিয়ে তা আটকে গেল। সরকারি পে-স্কেল হওয়ার পর মজুরি নির্ধারিত হয়। এবারের আগেরবার যখন পে-স্কেল ঘোষণা হয়, তারপর মজুরি নির্ধারণ হলো পে-স্কেলের পরের সর্বনিম্ন ধাপে।

মালিকরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সরকারে থাকে, সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায়ই দেখা যায়, আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা কনটেম্পট অব কোর্টের মধ্যে পড়ি। সেবার জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি যখন প্রায় ঠিক হয়ে এসেছে, তখন বাংলাদেশ অ্যাম্প্লয়ার্স অ্যাসেসিয়েশন সেটা স্টে করার জন্য হাইকোর্টে রিট করে। পরে মান্নান সাহেব একটা রিট দেন যাতে স্টে করা না হয়। কিন্তু তারপরও সেটা আটকে যায়। পিএমএর কার্যালয়ে বসছি, সেখানে মালিকরা নীতিগতভাবে ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি মেনে নিল। আমরা তখন বললাম আমরা যে, আমরা এত আলোচনার পর খালি হাতে ফিরব কেন?

শ্রমিক যদি আন্দোলন না করে তাহলে ন্যূনতম মজুরি ক্যালরি না কী দিয়ে মেপে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে আলাপ করে কোনো লাভ হবে না। এখন তাহলে সমস্যা কী?

শ্রমিকদের ওপরে নির্যাতনের শেষ নাই। কয়েকদিন আগে পাটকল শ্রমিকেরা মজুরি নিয়ে আলোচনায় বসেছে। রাতে সেক্রেটারিয়েটের ভেতর মার খেয়ে ফোন দিয়েছে। জানতে চায়, তারা কি করবে। বললাম, মার যখন খেয়েছেন, তখন আপনারা কিছু না নিয়ে ফিরবেন না।

বাংলাদেশে পরিবহন যে অবস্থায় আছে তাতে সব সেক্টর মিলে লড়াই করলে একটা রেজাল্ট আসবে। চট্টগ্রামের ডিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, এই সংগঠন রেজিস্টার্ড না সুতরাং তারা ইউনিয়নের আবেদন করলে দেওয়া হবে না। এভাবে একজন ডিসি আমার ফ্রিডম অব এসোসিয়েশনে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।

সব মালিক শ্রমিকের কাছে মাফ চায়। আমি আজ পর্যন্ত কোনো মালিক দেখি নাই যিনি মাফ চাননি। একটা কিছু দাবি করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বলতে থাকেন ব্যবসায় লাভ নাই, এখন মাফ করেন। যখন এক বছর ফেরির ম্যানেজারি করলে পরের বছর একটা ফেরির মালিক হওয়া যেত, তখনও মালিকেরা যে কথা বলেছে, আজো তা বলছে। মালিকেরা এখন খাতওয়ারি মজুরিই দিতে পারছে না। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁরা বিবেচনা করবেন বা করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

 

রাজেকুজ্জামান রতন

সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট এবং কেন্দ্রীয় নেতা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

মূল প্রবন্ধে যেভাবে বলা হয়েছে, তার বাইরে খুব বেশি কিছু বলার নেই। তবু আলোচিত বিষয়গুলোর ওপরে নিবিড় আলোচনা করা যেতে পারে। মজুরি প্রশ্নে মালিকদের মনোভাবটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। লক্ষ করলে দেখবেন যে, দরকষাকষির সময় মালিক শুরু থেকে শ্রমিকদের দুর্বল করে ফেলে। প্রথমে সে যে কৌশলটি খাটায় তা হলো: “আমরা কাজ না দিলে তোদের কী হতো?” এক মালিক আমাকে বলেন, “জানেন, গার্মেন্টসে কাজ না দিলে মেয়েরা কোথায় যেত? পতিতা হতো।”

মালিকদের আমরা কি বলতে পারি না, “আমরা কাজ না করলে তোমাদের এত সম্পদ কোথা থেকে আসত?” নজরুলের সেই কথা বলতে হয়, “কত পাই দিয়ে কুলিদের/কত ক্রোড় পেলি বল্?”

বড় কারখানা মজুরি বাড়াতে পারবে না, কারণ তাহলে তাদের মুনাফা কমে যাবে। এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শিল্পপতিরা বিনিয়োগের জন্য অর্থ পাবে না। ছোট কারখানার ক্ষেত্রে বলা হয়, ছোট কারখানা, এরা বেশি মজুরি দিলে টিকবে না। বিষয়টা হচ্ছে একটা কারখানা আমার কম মজুরি নেওয়াতে রক্ষা পাবে তা না, ওটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়মে ধ্বংস হবে অথবা টিকে থাকবে। যে কারখানা টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করবে, সেটি টিকবে। যে কারখানা তার ব্যবস্থাপনা, হিসাব বিভাগ, প্রযুক্তির উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা ইত্যাদি বাড়াতে পারবে বা ঠিকঠাক চালাতে পারবে, সেটি টিকে থাকবে।

কিছুদিন আগে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় মজুরি নিয়ে বিরাট আন্দোলন হয়। কম্বোডিয়ায় হায় হায় রব উঠে গেল যে, গার্মেন্টস কারখানা সব ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু কালকের রিপোর্ট, ওখানে গার্মেন্টস কারখানার আরও প্রসার ঘটছে। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী ১৭৫ ডলার দিয়েই ঘটছে। তাতেই ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটছে।

আমরা যদি মালিকের শ্রমিককে দেওয়ার ক্ষমতা কত তা দিয়ে মজুরি নির্ধারণ করতে যাই, তাহলে কোনোদিন সঠিক মজুরি দিতে পারব না। মালিকরা দেয় ঠিক ততটুকু যতটুকু না দিলেই নয়। আর শ্রমিকরা যতটুকু আদায় করতে পারে ততটুকুই নেয়। একজন মালিক আমাকে বলে, “আমি চাইলে তিরিশ হাজার পর্যন্ত মজুরি দিতে পারি কিন্তু সবার তো সেই ক্ষমতা নাই।” আসলে শ্রমিকরা এখন পর্যন্ত তিরিশ হাজার টাকা মাসিক মজুরি এখনো সেরকম করে দাবি করতে পারেনি বলেই আমাদের মজুরি তিরিশ হাজার টাকা হয়নি।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নির্ণায়ক হিসেবে ‘মালিকদের সক্ষমতা’ বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। কারণ, সক্ষমতা বাড়লেই মালিক বেতন বাড়িয়ে দেন এমন নজির যেহেতু নাই, তাই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রও এ বিষয়টি বিবেচনা করা ঠিক নয়।

বুঝতে হবে একটা দেশের উৎপাদনশীলতা মজুরির ওপরে নির্ভরশীল। মজুরি না বাড়লে, শ্রমিকদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ভালো ব্যবস্থা না হলে উৎপাদনশীলতা তো বাড়বে না। কাজ করেও শ্রমিকেরা যদি দরিদ্র থেকে যায়, তবে সেটা কোনো সমাধান নয়।

এখানে আইনের প্রসঙ্গ এসেছে। শ্রম আইনসহ বিভিন্ন আইনে অনেক সমস্যা থেকে গেছে। আইন প্রণয়নে বিবেচনা বোধটাই প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন কারা বেকার, বা কাদের বেকার বলে ধরা হবে। এখানে অনেক কাজ যা আসলে রোজগারের জন্য যথেষ্ট নয়, তাকেও কর্মসংস্থান হিসেবে ধরা হচ্ছে। আইন একটা দারুণ হিসাব করে দিয়েছে আমাদের যে, সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ করে যে, তাকে বেকার বলা যাবে না। এ হিসাবে তো দেশে কোনো বেকার থাকে না। এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। 

জাপানে কেন রোবটের দিকে যাচ্ছে? কেননা সেখানে শ্রমিকরা আর সন্তান নিচ্ছে না। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অপুষ্টির সমস্যা সেখানে। ওখানে শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়ার সময় ইন্টারভিউতে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমার কি রাতে কাজ করার সামর্থ্য আছে?’ শ্রমিকের ভেতর একটা জিজ্ঞাসা জাগিয়ে দেওয়া জরুরি - ‘আমি কি কেবল মালিকের জন্যই বেঁচে থাকব?’

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে আমাদের যেটা করতে হবে, প্যারামিটারগুলো ঠিক করতে হবে যা দিয়ে ছয় সদস্যের একটা পরিবার বেঁচে থাকতে হলে যত টাকা প্রয়োজন সেটাই ন্যূনতম মজুরির ভিত্তি হবে।

শ্রমিকদের মধ্যে চাওয়ার বোধটা বাড়ানো, সেটা করতে পারলে কাজ হবে। এজন্য শ্রমিকদের সচেতন করতে হবে। এর দায়িত্বটা শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিতে হবে।

 

জোনায়েদ সাকি

সাধারণ সম্পাদক, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং প্রধান সমন্বয়কারী, গণসংহতি আন্দোলন

একাত্তর সালের একটা প্রেক্ষাপট ছিল ঊনসত্তরের বিভিন্ন জায়গায় ন্যূনতম মজুরির বিরাট আন্দোলন। জীবনের নিরাপত্তা, মজুরি এসবই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি।

ঊন-বিংশ শতকে কয়লা শ্রমিকেরা যেমন জোর দেখাতে পারতো বিংশ শতাব্দীতে তেল শ্রমিকেরা আর তেমন জোরদার আন্দোলন করতে পারছে না। কারণ আগে কয়লা ছিল মূল জ্বালানি এবং তাতে বহু শ্রমিক নিয়োজিত থাকতো। ফলে সে শ্রমিকদের কাজ করা বা না করার বিষয়টি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। তেল শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটা নাই। ফিল্ড দুর্বলতর হয়ে গেছে। কারণ তেল শিল্পে তুলনামূলকভাবে অনেক কম মানুষ কাজ করে। আবার এখন অনেক বিকল্প জ্বালানিও আছে। তাই শ্রমিকেরা ধর্মঘট করে বা এ ধরনের কিছু করে মালিকদের কব্জা করতে পারছে না। এই দুর্বলতার সুযোগে শিল্প মালিকরা অনেক ফ্যাসিস্ট আইন চাপিয়ে দিতে পারছে। তা বাংলাদেশের মতো বিশ্বের সর্বত্রই হচ্ছে।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরির জন্য যে জোরদার-প্রাণান্ত আন্দোলন দরকার সেটাই আজ পর্যন্ত করা সম্ভব হয়নি। ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ) এখনও পর্যন্ত কোনো জোরদার আন্দোলন করতে পারে না। ট্রেড ইউনিয়নের ফেডারেশনের শক্তি খুব কম কিন্তু আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

একটা বড় ভুল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ঘটছে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষ ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করছে। সবাই জানে ৫০০০ টাকা দিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়, কিন্তু সবসময় সেটাই ন্যূনতম মজুরি দেওয়া হবে। এভাবে একটা লো-ইনটেনসিটি অ্যানার্কি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রেসক্লাবে নার্সরা আন্দোলন করছেন, ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর ছবি। আমরা [আন্দোলনকারীরা] দাবি পূরণে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই! আশির দশকে এটা কল্পনাও করা যেত না। খুলনায় পাটকল শ্রমিকদের মধ্যে একটা শক্ত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতি হয়েছিল বলেই তারা সেসময় দাবি আদায় করতে পেরেছে।

দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি যদি একজোট হয়, তবে জাতীয় ন্যূনতম মজুরির মতো অনেক দাবিই আদায় করা সম্ভব হবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন। আমরা এক সময় রেড ট্রেড ইউনিয়নের কথা বলতাম। যারা এর বাইরে, তাদের উপেক্ষা করবার একটা প্রবণতা ছিল। ওটা করা যাচ্ছিল কারণ তখনো শ্রমিক সংগঠনগুলোর কিছু শক্তি-সামর্থ্য ছিল। এখন উল্টো। একটা বিষয় কিন্তু আমাদের রিয়ালাইজেশনে এসেছে যে, শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য দরকার। রেড না হোক গ্রিন বা যেকোনো রঙের একটা অ্যালায়েন্স হওয়া দরকার। সেখান থেকে আন্দোলন পরিচালিত হোক। যার খুশি নেতৃত্বে থাকুন, তাতে টাফের কোনো আপত্তি নেই। আমরা শ্রমিক আন্দোলন করতে চাই। কিন্তু সবাইকে একটা বিষয় বিবেচনা করা উচিত যে, আজকে যদি একটি প্রোগ্রেসিভ আন্দোলন গড়ে না ওঠে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় এই প্রোগ্রেসিভ অংশ এগিয়ে না আসে, তাহলে সরকার-বেসরকারি সেক্টরে দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হবে না। আর তা না হলে, শ্রমিকের কোনো অধিকার আদায় করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

 

নজরুল ইসলাম

অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার অবকাশ আছে। মূল প্রবন্ধের শুরুতে ‘শ্রমজীবী মানুষেরা বড়লোক হওয়ার খোয়াব দেখছেন’ এই বাক্যে আপত্তি আছে।

‘শ্রমিকরা ঘরের টাকা দিয়ে কারখানা চালায়’ - বিষয়টি আসলে এখন তাই দাঁড়িয়েছে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবি নিয়ে স্কপসহ শ্রম প্রতিষ্ঠানগুলো আন্দোলন করে আসছে। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ আছে।

বাংলাদেশের আইনে অনেক ধারা আছে যেগুলো মালিকদের স্বার্থে রাতারাতি পরিবর্তন করা হয়। শ্রম আইন ভঙ্গ করার জন্য মালিকদের যে শাস্তির বিধান, তা কমতে কমতে এখন প্রায় কিছুই নাই। আগে কারাদণ্ড ছিল, তারপর সেটা অর্থদণ্ড, এখন সেটা এতই নগণ্য যে তা থাকা আর না থাকায় কোনো পার্থক্য নাই।

গণমাধ্যম এখন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ব্যাপারে নেতিবাচক সংবাদ দিচ্ছে যে, ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা খারাপ, তারা মালিকের কাছে পয়সা খায় এসব। এসবের বিরোধিতা করতে হবে। গণমাধ্যমকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে সঠিক সংবাদ পরিবেশনের জন্য। এজন্য শ্রমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে বসে আলাপ আলোচনা করা।

মজুরি নিয়ে আলোচনাগুলোতে মালিক পক্ষের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তাদের মতামতগুলোও শোনা দরকার। আবার আমাদের পর্যালোচনাগুলো তাদের জানান প্রয়োজন।

‘লিভিং ওয়েজ’ শব্দটির ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে, ন্যূনতম মজুরি বললেই হয়। এখানে এনজিওবাজির বিষয়টিও এসেছে। দেখতে হবে শ্রমিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করছে কারা। যার টাকা আছে, অস্ত্র আছে, তারা কেন শ্রমিকের কথা শুনবে?

বিলস, বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) সহ যারা এ নিয়ে ভাবছে, কাজ করছে, তারা সবাই নিবিড় হয়ে কাজ করতে পারি। খালি তো মজুরি নয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য নানা বিষয় আছে যা জাতীয় ন্যূনতম মজুরির আলোচনায় আসতে হবে।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের জন্য যে কোনো উদ্যোগে বিলস আগের মতোই অংশ নেবে এবং সাধ্যমত কাজ করবে।

 

মাহমুদুল হাসান সুমন

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লিভিং ওয়েজের কথা কেন বলছি? আওয়ারলি ওয়েজের কথা কেন বলছি? আসলে গ্লোবাল ট্রেড ইউনিয়নগুলো এসব ধারণা গঠন করেছে। আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ধারণার প্রয়োগ কীভাবে করব? এসব নিয়ে আরও ভালোভাবে আলোচনা হওয়া দরকার।

শ্রমিক নেতা ও শ্রমিকদের মধ্যে একটা গ্যাপ রয়েছে। শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অনেক ক্ষেত্রে নেই। তাজরীন গার্মেন্টসে আগুন লাগার পর আমরা গিয়ে দেখলাম যে, অনেক বাড়িতে [একটি খানায়] একজন কাজ [আয়] করছিল না, কয়েকজন মিলে আয় করছিল। মানে একজনের আয়ে শ্রমিকরা সংসার চালাতে পারে না। তো আমরা এ ধরনের পরিসংখ্যানগুলো পাই না, যারা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তারা এটা দেখি না। সুতরাং আমরা মনে করি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের নানা ধরনের সংশ্লিষ্ট গবেষণা করার গুরুত্ব আছে।

গার্মেন্ট শিল্পের জন্য মজুরি বিবেচনা করতে গিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে জড়িত। আবার দেশীয় শিল্পের ক্ষেত্রে অন্যভাবে বিষয়টি আলোচনা করতে পারি। আমাদের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরিতে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সস্তায় পোশাক তৈরি করে বিরাট মুনাফা করছে। সে ক্ষেত্রে কেবল দেশী মালিকরা নয়, বরং বিদেশী মালিকদেরও বিবেচনায় রাখা উচিত।

 

শহীদুল ইসলাম সবুজ

অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরাম

পুরো বিষয়টিই সমস্যার। মজুরি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নিজেই বলেছেন বোর্ডে যা আলোচনা হয়, যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাকেই ভেঙে দেয় মালিক পক্ষ। এবং শেষ পর্যন্ত দেশের প্রধান নির্বাহী যা বলেন সেটাই হয়। সুতরাং আমরা শ্রমিক সংগঠন যা বলি, যা-ই বলি না কেন তা আর কেউ শোনে না।

সবাই জানি, শ্রমিক সংগঠন যখন আন্দোলন করা শুরু করে, তখন মালিক পক্ষ চীৎকার করে বলে: ঐ যে গার্মেন্ট সংগঠনগুলো শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।

মজুরি নির্ধারণে যদি আমাদের থেকে কোনো মতামত বা পরামর্শ চাওয়া হয়, তাহলে সে বিষয়ে আমাদের বক্তব্য একটাই: আন্দোলন, আন্দোলন, আন্দোলন। একমাত্র আন্দোলনই এ সমস্যা সমাধানের উপায় বলে আমরা মনে করি। 

 

কল্লোল মুস্তাফা

প্রকৌশলী ও অধিকার কর্মী

আজকে শুক্রবার বাজারে গিয়েছি। সেখানে মুরগির দোকান। গার্মেন্টস শ্রমিকরা আসেন, অন্যরাও আসেন। অনেকে এসে মুরগি কিনে নিয়ে যান। আর মুরগির দোকানে যে ঠ্যাং পড়ে থাকে, সেগুলি খান শ্রমিকরা বা নিম্নআয়ের মানুষরা। প্রশ্ন হলো, শিল্প বাঁচাতে হলে কি শ্রমিককে মুরগির ঠ্যাং খেয়েই থাকতে হবে?

এমন যদি হয়, বাজারে সূতার দাম বাড়লে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন কি গার্মেন্টস মালিক সূতার কল মালিকদের কাছে গিয়ে বলবে, ‘ভাই, আমার কারখানা ধ্বংস হয়ে যাবে যদি দাম বাড়ে। আপনি অর্ধেক দামে সূতা বিক্রি করেন।’ এমনটা ভাবাই যায় না।

শ্রমিকের বাঁচার জন্য ন্যূনতম যা লাগবে, তা অন্তত মজুরি হিসাবে দিতে হবে। আমরা দেখছি শিল্পকে টিকতে হয় নানাভাবে, কখনো কখনো রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। মানে জনগণের টাকা থেকে কারখানাকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এসবের জন্য শ্রমিকের স্যাক্রিফাইস করা যাবে না।

ন্যূনতম মজুরি কত হবে? তার সোর্স অব ডেটা কী হবে? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি নির্ধারণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে যে তা হয়নি সেটা দুঃখজনক। বহু সেক্টর আছে, কোন সেক্টরের কী পরিস্থিতি তার তথ্য আমাদের কাছে থাকা উচিত। এই সবগুলো জায়গাকে একত্র করে একটা জায়গায় এসে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনও করতে হবে। এটা সুসংগঠিতভাবে করতে হবে।

 

 

 

মুক্ত আলোচনা পর্ব

===============

 

শাহ আলম সোহেল

সদস্য, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম

সবাই স্পষ্ট করেছে একটা জোরালো আন্দোলন করতে হবে। আমি ২০০৬ সাল থেকে গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসাবে কাজ করছি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আলোচনা-সেমিনার করে কিছু হবে না, আন্দোলন করতে হবে কারখানায় গিয়ে। এসব আলোচনার সারবত্তা সহজ ভাষায় মাঠে গিয়ে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে না। শ্রমিকরা প্রশ্ন করে, ‘আমার চাকরি থাকবে তো? নাকি আমি মজুরি চাইতে আন্দোলন করব?’ শ্রমিকদের বোঝাতে হবে, আন্দোলন না করলে চাকরি, মজুরি কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা থাকবে না। সারা বাংলাদেশে ঘুরে ঘুরে শ্রমিকের কাছে এ তথ্যগুলো পৌঁছাতে হবে। সেটা করা গেলেই কেবল শক্তিশালী আন্দোলন করা যাবে।

 

মবিনুল আলম মবিন

সদস্য, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম

আমাদের শ্রমিকদের মজুরির আলোচনাতেই বন্দী করে রাখা হয়েছে। মজুরি ছাড়াও আরও অনেক বিষয় আছে। কারখানার ভেতরে নিরাপত্তা, বাসা পর্যন্ত আমার নিরাপত্তা এসব নিয়ে কথা হওয়া দরকার। অনেক নারী শ্রমিক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শ্রমিকদের দমনে এখন আছে মাস্তান। প্রতি গার্মেন্টস মালিক মাস্তান পালে। তারা বাসায় হামলা চালিয়ে সেই শ্রমিকদের উচ্ছেদ করে। কারখানায় সেই শ্রমিককে কিছু বললে, অন্য শ্রমিকরা তার পাশে দাঁড়ায়। তাই কারখানায় মালিক কিছু বলে না, বাসায় মাস্তান দ্বারা হামলা চালায়। আমার সারাদিন যায় কাজ করতে, আমার স্ত্রীও গার্মেন্টসে কাজ করে। আমার সন্তানের সঙ্গে আমার দেখা হয় না। একটা শ্রমিককে যে টার্গেট দেওয়া হচ্ছে সেটা সে পূরণ করতে পারছে না। একজন শ্রমিক কত টার্গেট পূরণ করতে পারবে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। এখন অমানবিক সব টার্গেট দেওয়া হচ্ছে।

 

অঞ্জন দাস

সদস্য, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি

ন্যূনতম মজুরির জন্য ২০১৩ সালে আমরা একটা হিসাব করেছিলাম। সবকিছু হিসাব করে আমরা দেখেছিলাম ২২,০০০ টাকার মতো লাগে। কিন্তু তবু আন্দোলনের স্বার্থে ১২,০০০ টাকার দাবি করে আন্দোলন শুরু করি।... এখন মজুরির দাবিতে আন্দোলন করতে গেলে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই যে শ্রম আইন, এটা আমার ন্যূনতম মজুরি তো দূরের কথা সাধারণ মানবিক অধিকারও নিশ্চিত করতে পারছে না। এ আইন করা হয়েছে মালিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, শ্রমিকদের নয়। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি দাবি ব