সক্রিয় নারীরা কোনো বাধাকে চলার পথে প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেননি: ইউনিয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা
বাশি প্রতিবেদক | ১৮ আগস্ট ২০১৬ | ১২:৩৭

বাংলাদেশে শ্রমিকদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন চর্চার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সঠিক সাংগঠনিক চর্চার অভাব শ্রমিকদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, কর্মনিষ্ঠা, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষা ও অধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি বদলে ছড়িয়ে দিচ্ছে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, নিরাশা আর প্রতিক্রিয়াশীলতা বিস্তৃত জাল। এতে শ্রমিকদের কেবল নয় অকল্যাণ হচ্ছে সমাজ ও দেশের। একটি সুন্দর-ন্যায়নিষ্ঠ-প্রগতিশীল সমাজের পথে এ এক বিরাট পিছুটান। দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান ইউনিয়নগুলোর মধ্যে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ অনেক কম। এর মধ্যে নারী শ্রমিকদের ইউনিয়নে অংশগ্রহণের মাত্রা আরও কম। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোতে অংশগ্রহণ এবং সক্রিয়তার ক্ষেত্রে নারীদের কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয় কিনা এবং এ ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো তাঁদের ইউনিয়নে আসার পেছনে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে, তা জানার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)। দেশের বিভিন্ন স্তরের ও খাতের নারী শ্রমিকদের সাথে আলাপের মাধ্যমে বিষয়টি আরও গভীর ও বিস্তারিতভাবে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকার সাভারে নারী পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে একটি দলীয় আলোচনা করা হয়। আলোচনায় ভাদাইল অঞ্চলের পাঁচটি ভিন্ন পোশাক কারখানার ছয় জন নারী শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তার একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।

আমাদের দেশে কারখানাগুলোতে সংগঠন বা ইউনিয়নের সাংগঠনিক তৎপরতার বিরাট ঘাটতি রয়েছে। এজন্য আইনি বাধ্যবাধকতার অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক জটিলতাই প্রধান দায়ী। এছাড়া বিদ্যমান ফেডারেশন বা ইউনিয়নগুলো যেমন নিজেদের প্রচার প্রচারণার দিকে মনোযোগী নয়; তেমনি শ্রমিকদের, বিশেষত নারীদের মধ্যে, এগুলো নিয়ে আগ্রহ তেমন দেখা যায় না। ‘কারখানা বা কর্মস্থলে কোনো সংগঠন বা ইউনিয়ন আছে কিনা’—এ প্রশ্নের জবাবে অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, কর্মস্থলে এ ধরনের ইউনিয়ন-সংগঠন নেই, আবার কেউ জানিয়েছেন সংগঠন রয়েছে। বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, কর্মস্থলে সংগঠন থাকলেও সেগুলোর নাম তাঁরা জানেন না। কল্পনা নামের এক নারী শ্রমিক বলেছেন, তাঁর কারখানার সংগঠনের নেতাদের মধ্যে একজনের নাম‘হুমায়ুন’তিনি কেবল এতটুকুই জানেন। কিন্তু বিস্তারিত আর কিছু জানেন না, এমনকি সংগঠনের নামও। তবে পোশাক কারখানাগুলোতে ওয়ার্কার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউডব্লিউএ) রয়েছে, এ তথ্যটি বেশিরভাগ আলোচনাকারীই জানেন। এটি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি মালিকপক্ষের বলে মনে করেন তাঁরা। এর পেছেনে কারণ হিসেবে তাঁরা জানান, এসব সংগঠন শ্রমিকদের কোনো কথা বলে না। হিপহপ টেক্সটাইলের শ্রমিক বেগম জানান, ডব্লিউএ থাকলেও তা কার্যকর নয়। তিনি আরো জানান, একটি সংগঠন মিটিং করে পরিচিত হয়েছে, কিন্ত সেখান থেকে কোনো পরিচয়পত্র দেওয়া হয়নি।

কোনো সংগঠন বা ইউনিয়ন না থাকলেও নারী শ্রমিকেরা স্ব-উদ্যোগে কোনো সংগঠন বা ইউনিয়ন গঠন করতে আগ্রহী হননি। এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখা গেছে, নারী শ্রমিকদের মধ্যে সক্রিয় বা উদ্যমী হয়ে উঠার ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি এ ধরনের কোনো কিছুতে জড়িত বা উদ্যোগী না হওয়ার পেছনে সামাজিক, পারিবারিক ও চাকরি হারানোর ভয়ও কাজ করেছে। এছাড়া দীর্ঘ শ্রম সময়ের কারণেও অনেকে উৎসাহ পান না। গোল্ডেন কটনের শ্রমিক শিল্পী জানান, কেউ কখনও সংগঠন করতে বলেনি, তাই তিনি নিজেও এ নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেননি। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী শিল্পীর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। আবার কেউ কেউ সংগঠন করা নিয়ে ভীতিও প্রকাশ করেছেন। একজন অংশগ্রহণকারী জানান, এ ধরনের কিছু করার সাহস তাঁর হয়নি। এছাড়া ঘণ্টাপ্রতি প্রোডাকশন দিতে হয় বলে সময়ও হয়ে উঠে না।

এ বিষয়ে হিপহপের বেগম ও জিনি উইয়ারের শ্রমিক ময়না জানান, তাঁদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় কাজ করেছে। তাঁরা বলেন, সংগঠন বা ইউনিয়ন করলে কারখানা প্রশাসনের লোকেরা যদি কোনো ক্ষতি করে, এ ভয় তাঁদের মধ্যে রয়েছে। এ সময় তাঁদের সঙ্গে উপস্থিত বাকিরাও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন।

আলাপের সময় তাঁদের কথার মধ্য দিয়ে কর্মপরিবেশের চিত্র উঠে আসে। তাঁরা জানান, বেশির ভাগ কর্মস্থলে শ্রমিকদের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন চলে, যা কখনোই প্রকাশিত হয় না। তাঁরা বলেন, ইউনিয়ন বা সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হলে গায়ে হাত তোলার চেষ্টা চালায় মালিকপক্ষ। জোর করে কাজ ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটে অহরহ। তাঁরা জানান, এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে ডেকে নিয়ে ধমক দেওয়া হয়। কারো সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বাকি শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে কোনো প্রতিবাদ করেন না, কারো পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা আরও বিরল। অর্থাৎ শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণী সংহতির ঘাটতি দেখা যায়।

শ্রমিক সংগঠন বা ইউনিয়ন করার জন্য পরিবার থেকে কোনো উৎসাহ দেওয়া হয় কিনা জানতে চাইলে অংশগ্রহণকীরা জানান, অনেক মেয়েই এ বিষয়ে আগ্রহী কিন্তু পারিবারিক বাধা কাজ করে। ময়না জানান, এসব সংগঠন করার দরকার নাই বলে পরিবার থেকে প্রায়ই সতর্ক করা হয়। এছাড়া নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শ্রমিক সংগঠনে না আসার পেছনে এগুলোর প্রতি অনাস্থাও কাজ করে। ময়না জানান, সংগঠন করার আগ্রহ থাকলেও সবাই বিদ্যমান ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলোকে ‘ভেজাল’ বলে জানায়। আর নারী বা পুরুষ সকলেরই সংগঠন করার প্রতি ভীতি কাজ করে। কল্পনা বলেন, সংগঠন করলে রাস্তায় বের হতে হবে — এ নিয়েও অনেকে ভয় পান। ব্রুনেটের জামিলা জানান, তিনি নিজেও এগুলোর সঙ্গে জড়াতে ভয় পান। এছাড়া সবাই নিরুৎসাহিত করে, ভয় দেখায়। কথা বলার প্রয়োজন নাই — এমনটা বলে। সময়ের অভাবের কথা জানান ফ্যাশন গার্মেন্টেসের কর্মী কাজল।

এর ব্যতিক্রমও রয়েছেন কেউ কেউ। মিছিলে যান বলে জানান শিল্পী। এসব কাজে যেতে কেউ বাধা দেয় না বলে জানান তিনি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, নিজে থেকে সক্রিয় নারীরা কোনো বাধাকে চলার পথে প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেননি।

সংগঠনে করতে গেলে সংগঠনের পুরুষরা বাধা হিসেবে কাজ করে কিনা জানতে চাইলে অংশগ্রহণকারীরা সবাই জানান যে, পুরুষদের সঙ্গে কাজ করতে কোনো সমস্যা নেই। এছাড়া সবাই একসঙ্গে থাকলে ভাল হয় বলে জানিয়েছেন তাঁরা। এদিকে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত পুরুষদের সমস্যা নিয়েও কথা বলেন তাঁরা। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, কারখানায় ছেলেরা বেশি থাকলে বেশি প্রতিবাদ হয় — এ কারণে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ ছেলেদের কাজে নিয়োগ দিতে চায় না। দলীয় আলাপে অংশগ্রহণকারীরা জানান, কেউ ইউনিয়ন করতে গেলে কারখানায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, লাইনম্যান, সুপারভাইজাররা গায়ে হাত তোলে।

এসব সত্ত্বেও ইউনিয়ন করার প্রতি উৎসাহ দেখিয়েছেন তাঁরা। অংশগ্রহণকারীরা জানান, দশজন একসঙ্গে থাকলে ইউনিয়ন করা যায়। আর যেসব বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো দূর করা হলে সবাই ইউনিয়ন করবে বলে মনে করেন তাঁরা।

একটি শ্রমিক সংগঠন কি ধরনের কাজ করতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তরে বেগম বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ হতে পারে। এর মধ্যে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ, দুপুরে টিফিন, ওভারটাইম অনধিক দুই ঘণ্টা, সপ্তাহিক ছুটি, প্রোডাকশন সংক্রান্ত দাবি নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। ময়নার মতে, সংগঠন কর্মপরিবেশ উন্নত করার দিকে দৃষ্টি দিতে পারে। কারখানায় বকাঝকা বন্ধ করা এবং শ্রমিকেরা যাতে মান-সম্মানের সঙ্গে করতে পারে—এমক বিষয় নিয়ে সংগঠনগুলো কাজ করতে পারে। বাকিরাও তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কল্পনা জানান, ইউনিয়নগুলো সবার চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে কাজ করতে পারে। এছাড়া রাত্রীকালীন ডিউটি যেন বেশি না হয় এটা নিয়েও কথা বলা যেতে পারে।

বাছাই দলের আলোচনায় উপস্থিত নারী শ্রমিকদের মন খুলে কথা বলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তাঁরা জানান, অবশ্যই তাঁরা নানা বিষয়ে মন খুলে কথা বলতে চান। শিল্পী বলেন, এমন সংগঠন তাঁরা চান, যেটি সবার সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারবে।

আশার পাশাপাশি তারা হতাশার কথাও বলেন। প্রকৃত সংগঠন এবং সংগঠকের অভাবের কথা জানান। নারীরা জানান, শ্রমিকদের দাবি নিয়ে বা তাদের পক্ষে কথা বলবে এমন লোক নাই। যারা ছিল তাদেরকে হয়ত মালিকপক্ষ বের করে দেয়। শ্রমিকদের হয়ে ডাক দিতে পারবে এমন লোকের অভাব বোধ করেন তাঁরা।

এদিকে আনুষ্ঠানিক আলাপের মধ্যে নানা বিষয় নিয়েও তাঁরা কথা বলেন। তার মধ্যে একটি হলো যদি পরিবার বা কর্মক্ষেত্র থেকে বাধা না আসে তবে সংগঠন করার ইচ্ছা। আরেকটি হলো, নারী শ্রমিকদের সময়ের অভাব। শ্রমিকরা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, তাঁরা বাচ্চা সামলান, রান্না করেন, কারখানাতে কাজ করেন, এতকিছুর পর তাঁদের হাতে আর সময় পাওয়া যায় না। এমনকি ছুটির দিনেও সময় থাকে না তাঁদের।

নারী শ্রমিকদের সঙ্গে এ আলাপটি একটি চলমান গবেষণার অংশ। ফলে একটি দলীয় আলাপ থেকে প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ উঠে আসবে এমনটি নয়। তবু এ প্রয়াস থেকে কিছু চিত্র উঠে এসেছে। এ আলাপচারিতায় শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন বা ইউনিয়নের অভাব, সংগঠকের ঘাটতি এবং শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণী চেতনার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুসারে কাজের শিক্ষার অভাবের বিষয়টিও এসেছে।

এ ধরনের আলাপের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য বের করে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা দেখা যায়। যেমন, দলীয় আলাপে সকলের অংশগ্রহণ একই রকম হয় না। অনেক বেশি আদর্শিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা থাকে। নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচীর বাইরে আলোচনা চলে যায়। এছাড়া চেকলিস্ট ঘাটতি, অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, আলাপে পুরুষদের উপস্থিতি, অমনোযোগিতা ইত্যাদিও বাধা হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে একাধিক দলীয় আলাপ এবং ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

 

বাছাই দলের আলোচনার বিষয়:‘নারীর ট্রেড ইউনিয়নে আসার বাধা

স্থান: ভাদাইল, সাভার, ঢাকা

সঞ্চালক: ইসরাত জাহান

ধারা বিবরণী:  গোলাম মুর্শেদ

অংশগ্রহণকারীদের তালিকা:

নাম বয়স (বছর) পেশা ঠিকানা শিক্ষাগত যোগ্যতা বৈবাহিক অবস্থা
কাজল ২৬ ফিনিশিং ফ্যাশন গার্মেন্টস ৫ম শ্রেণি বিবাহিত
জেরিন ২৩ সুইং ডব্লিউ.বি গার্মেন্টস ৫ম শ্রেণি বিবাহিত
বেগম ২০ সুইং হিপহপ এইচএসসি শ্রেণি বিবাহিত
ময়না ১৬ সুইং জিনি ৮ম শ্রেণি বিবাহিত
শিল্পী ১৮ সুইং গোল্ডেন ৮ম শ্রেণি অবিবাহিত
জামিলা ১৭ ফিনিশিং ব্রুনেট ৫মর শ্রেণি বিবাহিত

 

‘নারীর ট্রেড ইউনিয়নে আসার বাধা’বিষয়ে বাশির আয়োজন করেছিল এক বাছাই দলের আলাপ। এতে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অভিমত ব্যক্ত করেন। তাঁরা জানিয়েছেন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে এবং তাতে সক্রিয় থাকতে একজন নারীকে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আলোচনায় উঠে এসেছে নিজে থেকে সক্রিয় নারীরা কোনো বাধাকে চলার পথে প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেননি।