শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৫ জুন ২০১৭ | ১১:৫৩
বাশির আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ছবি: বাশি

দেশের শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করতে পারে। এজন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) আয়োজিত “জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায়” বক্তারা এসব কথা বলেন।

ঢাকার পুরানা পল্টনে মনি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট ভবনে শুক্রবার [১২ মে ২০১৬ তারিখে] এ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বক্তব্য রাখেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি সহিদুল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ইকতেদার আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন, অ্যাডভোকেট নেসার আহমেদ, অ্যাভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টি বেকারী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আক্তারুজ্জামান খান, বাংলাদেশ বহুমুখী শ্রমজীবী ও হকার সমিতির সভাপতি বাচ্চু ভুঁইয়া, জাতীয় গণতান্ত্রিক শ্রমিক ফেডারেশনের আহ্বায়ক শামীম ইমাম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ইসমাইল এবং গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্টের সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের সভাপতি সৌমিত্র কুমার দাশ।

সভাপতিত্ব করেন বাশির ট্রাস্টি বোর্ড ও ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি শাহ্ আতিউল ইসলাম। আলোচনা সঞ্চালন করেন গোলাম মুর্শেদ।

সভাপতির ভাষণে শাহ আতিউল ইসলাম বলেন, “আমরা [বাশি] আশা করছি, যেসব সংগঠন গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ইস্যুকে কেন্দ্র করে কাজ করছে, কর্মসূচি নির্ধারণ করছে, তাদের সাথে একটা মৈত্রীর সম্পর্ক ও ঐক্য গড়ে তুলবো। এক্ষেত্রে বিলসও সহযোগিতা করতে পারে। তবে যারা ট্রেড ইউনিয়ন করছে, যারা শ্রমিক সংগঠনের সাথে কাজ করছে, ঐক্যের উদ্যোগটা আসলে তাদের মধ্যে থেকে আসতে হবে।”

তিন বলেন, “জাতীয় ন্যূনতম মজুরির আন্দোলনে বাশির ভূমিকা হতে পারে সহযোগীর। এ সংক্রান্ত গবেষণা ও বিশ্লেষণ করা, এর সুবিধার দিকগুলো শ্রমিকদের জানানো, এটা বাস্তবায়নে করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে আমরা বিভিন্ন কাজ করেছি, ভবিষ্যতে আরো অনেক কিছু করতে পারবো।”

আতিউল ইসলাম আরো বলেন, “শ্রমিকদের মধ্যে অনেক সংগঠন কাজ করছে। শ্রমিকরা এসব সংগঠনের মাঠপর্যায়ের ও জাতীয় নেতাদের থেকে ন্যূনতম মজুরি বিষয়ে আলাদাভাবে জানছে বা জানার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বিষয়ে সব শ্রমিকেরা কি একই ধারণা পাচ্ছে? আমরা যদি একটা বেইজ [ভিত্তি] ঠিক করতে পারি যে, এসব বেইজের ওপরে ভিত্তি করে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হতে হবে, তাহলে সেটা হবে প্রাথমিক থিওরিটিক্যাল [তাত্ত্বিক] কাজ। তারপর এর ওপরে কিছু গবেষণা, প্রকাশনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি হতে পারে। যার দায়িত্ব নিতে পারে বাশি বা বিলস। কিন্তু এসবকে শ্রমিকদের পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার কাজ মূলত শ্রমিক সংগঠনগুলোর।”

আনু মুহাম্মদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্যে শ্রমিকরা পরাজিত হয়েছে। বর্তমান অবস্থা হলো শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণি সংগ্রামে পরাজয় বরণের প্রতিফলন।”

তিনি বলেন, “আগে যে মজুরির আন্দোলন হতো, সেটা শ্রমিকরা করতো শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে। এখন শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আদমজী পাটকল ভেঙ্গে দেওয়াটা কেবল বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা কৌশল নয়, এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর মূল কথা হলো শ্রমিকদের এক সঙ্গে রাখা চলবে না। সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন এক পর্যায়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধন করতে পারে, এটা তারা জানত। তাই আদমজীর মতো বড় প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। শ্রমিকদের জন্য কিছু করতে বললেই সরকার নানা অজুহাত দেখাতে শুরু করে। দেশে শিল্পপুলিশের সংখ্যা বাড়ে, কারখানা পরিদর্শকদের সংখ্যা বাড়ে না। এসব হলো সরকার ও মালিকদের কৌশল।”

“বাংলাদেশের বুর্জোয়া শ্রেণী আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, কনসোলিডেটেড, তাই মোকাবেলাটাও সেভাবেই করতে হবে। মালিকদের ক্লাস ইউনিটি [শ্রেণি সংহতি] দাঁড়িয়েছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে হয়নি। এ কারণে [শ্রমিকদের] পরাজয়ও হয়েছে। বুর্জোয়াদের মোকাবেলা করতে হলে মাস লেভেলে [জনসাধারণের কাছে]-এ পয়েন্টটা নিয়ে যেতে হবে। সবার আগে দাবিটিকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন বইপুস্তক প্রকাশ, পোস্টার ছাপানো, গবেষণা করাসহ বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার কাজ করতে হবে,” বলেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।

তিনি আরো বলেন, “আমার বিবেচনা হচ্ছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন বুর্জোয়াঁজিদের দখলে। তারা ক্লাস হিসাবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কনসোলিডেটেড [সংহত], অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ, ম্যাচিয়ুরড [পরিপক্ব]; নিজেদের শ্রেণি স্বার্থটাকে ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম। এজন্য তারা ক্লাস [শ্রেণি] হিসাবে অনেক অর্গানাইজড [ঐক্যবদ্ধ]। তাই তাদের মোকাবেলায় আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু কারখানাভিত্তিক আন্দোলন করলে হবে না। দাবিগুলোকে একটা জাতীয় ঐক্যের জায়গায় নিতে হবে। তা না পারলে মানুষের ঐক্য দাঁড়াবে না। মালিকদের ক্লাস ইউনিটির [শ্রেণি ঐক্য] বিপরীতে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ঐক্য তৈরি করতে পারে এমনসব দাবি বা ইস্যুকে খুঁজে বের করতে হবে। আমি মনে করি, সারা দেশব্যাপী শ্রমজীবী মানুষদের ঐক্য গড়ে তোলার জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কমিউনিকেটিভ একটা দাবি।”

শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “শ্রমিকদের ভূমিকা ছাড়া ঊনসত্তরের কথা (১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলন) তো কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের অবদানের স্বীকৃতি কোথাও পেল না। এ দেশের ইতিহাস যাঁরা লেখছেন, তাঁরা শ্রমিকদের ভূমিকাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।”

শ্রমিক আন্দোলনের শক্তিগুলোকে একত্রিত করার ওপরে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ঊনসত্তরের জাতীয় ন্যূনতম মজুরিকে ভিত্তি ধরতে হবে। এ ছাড়া উপায় নাই। কারণ এরপর আর কোনো সরকার এ দাবি বাস্তবায়ন করেনি। এই দাবি আদায়ের জন্য এখন প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক শক্তি শ্রমিক আন্দোলনের নাই।... আন্দোলনে নামার আগে শ্রমিক আন্দোলনের বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। এখন শ্রমিক আন্দোলন দালালদের দখলে। এ থেকে শ্রমিক আন্দোলনকে মুক্ত করতে হবে। আন্দোলনের শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে হবে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবিটাকে এখন সব শ্রমিক সংগঠনের এক নম্বর ইস্যু হিসাবে সামনে নিয়ে আসা দরকার।”

চৌধুরী আশিকুল আলম বলেন, “জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আমরা ঐক্য গড়তে রাজী আছি। শ্রমিকদের স্বার্থে এই ঐক্য করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য যারা কাজ করছে, তাদের উচিত শ্রমিক এলাকায় ফিল্ড [গিয়ে পর্যবেক্ষণ] করা। যদি কোনো ফেডারেশন বা অন্য কেউ এই ঐক্য করতে কিছু করতে চায়, আমরা তার সাথে থাকব শ্রমিকের স্বার্থে। বিভিন্ন সংগঠনের সবার কাছে আজকে জাতীয় ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি একটি চিন্তার বিষয়, কিন্তু বস্তুত চাই শ্রমিকদের প্রেশার [চাপ]। শ্রমিক সংগঠনগুলো এ নিয়ে কর্মসূচি দিতে পারছে না। সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি পার্লামেন্টে নিয়ে যেতে হবে। এই পার্লামেন্ট কেমন, কিভাবে নির্বাচিত, সে রাজনৈতিক বিবেচনা এখানো প্রযোজ্য হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়।” 

ইকতেদার আহমেদ বলেন, “শ্রমিকদের অনেক বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মালিকরা অনেক শক্তিশালী। তারা অনেক সময় মজুরি বোর্ডের মানুষদের পারচেস করতে [কিনতে] চায়। দেখা গেছে, তারা এক্ষেত্রে অনেক সময় সক্ষমও হয়। এই যে মালিকরা যেভাবে মজুরি বাড়ানোর বিরোধিতা করে, প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয় বা শ্রমিক প্রতিনিধিরা যেভাবে কেবল সরকারের স্বার্থটাই দেখে থাকে, তাতে শ্রমিকদের কোনো অর্জন হবে না। তাদের আন্দোলন করতে হবে।”

সুলতান উদ্দীন আহমেদ বলেন, “জাতীয় ন্যূনতম মজুরির কনসেপ্টটা সবাইকে বোঝাতে হবে। ন্যূনতম মজুরি ঠিক করতে হবে কিছু বিষয়কে ধরে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতিও থাকবে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে সরকারি আমলাদের নিয়ে একটি স্থায়ী কমিটি করতে হবে, যা প্রতি বছর নির্দিষ্ট নিয়ামকের ভিত্তিতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারিত করবে। আমরা ২০০১ সালে যেটাকে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বলেছিলাম, তা ঠিক জাতীয় মজুরি ছিল না। সেটা ছিল কেবল শিল্প শ্রমিকদের জন্য। কার্যত জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কৃষি-শিল্প-সেবা সব খাতের শ্রমিকদের জন্য। এজন্য প্রথমে একমত হতে হবে বাম দলগুলোকে। প্রগতিশীল এই দলগুলোকে বলতে হবে, তারা যেন আমাদের এই দাবিটিকে তাদের রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করে এবং একে সামনে নিয়ে আসে।”