গার্মেন্ট কারখানা থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় বাশির উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ জানুয়ারী ২০১৯ | ০৪:৫০

এ মাসের শুরুতে ত্রুটিমুক্ত ন্যূনতম মজুরির আদেশের দাবিতে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের চাকরি থেকে বরখাস্ত ও হয়রানি করার ঘটনায় বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে বাশির সভাপতি শাহ্ আতিউল ইসলাম সংগঠনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতি প্রদান করেন।

 

শ্রম অসন্তোষের পর গার্মেন্ট কারখানা থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় বাশির বিবৃতি

বিবৃতি । ২৯ জানুয়ারি ২০১৯

এ মাসের শুরুতে ত্রুটিমুক্ত ন্যূনতম মজুরির আদেশের দাবিতে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের চাকরি থেকে বরখাস্ত ও হয়রানি করার ঘটনায় বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

সরকার ও নিয়োজকদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল যে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসামূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। কিন্তু শ্রমিকেরা তাদের ওই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে আন্দোলন থামিয়ে আলোচনার পথকে সুগম করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ করে দেওয়ার পরও আজ তাদের ওপরে মামলা, ধরপাকড়, হয়রানি, ছাঁটাই ইত্যাদি বন্ধ হয়নি। এ ধরনের তৎপরতা গার্মেন্ট শিল্পের জন্য হানিকর এবং শ্রমিকদের জন্য পরিতাপের ও প্রতারিত হওয়ার বিষয়। 

আজ মঙ্গলবার একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে শিল্পপুলিশের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, কেবল আশুলিয়া ও নারায়নগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানা থেকে গত রোববার পর্যন্ত অন্তত ৪৫০০ শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয়েছে। 

আরেকটি পত্রিকায় বলা হয়েছে, মজুরি আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে বা সমর্থন দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ৪০ জনকে। আন্দোলন চলাকালে দায়ের করা প্রায় ৩০টি মামলায় এসব শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এমন ছাঁটাই ও হয়রানি দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পখাতের জন্য দুঃখজনক, কারণ তা মালিক-শ্রমিকদের মধ্যকার আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ককে ধ্বংস করে এবং অবিশ্বাস ও অনাস্থাকে প্রসারিত করে, যা শেষাবধি শিল্পসম্পর্ককে বিনষ্ট করে, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতাকে ব্যহত করে। 

নিয়োজকদের বুঝতে হবে, তাঁরা যদি অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকেই এমন রূঢ়ভাবে দমন করতে উদ্যত হন, তবে তা শিল্পের জন্য ভালো নয়। কারণ অসন্তুষ্ট শ্রমিকেরা ভালোভাবে কাজ করে না, আর শিল্পবিকাশের সাথে সাথে শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়া প্রসারিত হওয়ার ফল যে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, সেটা বলাই বাহুল্য। 

প্রয়োজনে নিয়োজক নিশ্চয়ই কর্মীদের ছাঁটাই করতে পারেন, শ্রমিকেরাও কাজ ছেড়ে চলে যেতে পারেন। কিন্তু কোনোটিই ব্যবসার জন্য ভালো নয়। ছাঁটাই যেন প্রতিহিংসাজাত না নয়, সেটি নিশ্চিত করা খুব প্রয়োজন। মনে রাখা ভালো, শিল্পবিকাশ ও সমাজের জন্য বিশেষ কল্যাণকর বলেই শ্রমিকদের দরকষাকষি ও আন্দোলন করার অধিকার আইনী স¦ীকৃতি পেয়েছে। সাজা দেওয়া তখনই চলে, যখন সত্যিই অপরাধ সংঘটিত হয়। অথচ লঘু পাপে গুরু দ- দেওয়া যে ইনসাফ নয়, সেটি বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় কারোর। মালিকদের এটা অনুধাবন করা জরুরি যে, দাবিদাওয়া পেশকারী শ্রমিকদের দমনপীড়ন করা কোনো সমাধান নয়। সমাধান আলোচনায় এবং আইনসিদ্ধ দরকষাকষিতে। 

আজ গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে যদি অবাধ ও সুষ্ঠু ট্রেড ইউনিয়ন চর্চার সুযোগ থাকত, সিবিএ বা যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি থাকত, তাহলে শ্রমিকদের পথে নেমে সড়ক অবরোধ করে, যানবাহন ভেঙে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হতো না। সহজ পথটি বন্ধ হয়ে গেছে বলেই হয়তো সংঘাতের পথে পা বাড়াতে শ্রমিকদের কুণ্ঠা হয়নি। আর এ কারণে তাদের সাজা দেওয়ার নীতিটিও ত্রুটিপূর্ণ।

তবে একথাও সত্য যে, শ্রমিকদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কারখানার কর্মকর্তাদের মারধর, কারখানার ক্ষতিসাধন কিংবা সড়ক অবরোধ বা যানবাহন ভাঙচুর কখনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ হতে পারে না। প্রতিটি কারখানায় নিজেরা সংগঠিত হয়ে, ইউনিয়ন বা শ্রমিক সমিতি যে নামেই হোক, শ্রমিক কমিটি গড়ে দাবিদাওয়া বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা ও দরকাষাকষি করতে হবে। একদিনে সব দাবি পূরণ হতে হবে, এমন অনমনীয় ও গোঁয়াড় স্বভাব শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষতি ছাড়া কল্যাণ করে না। 

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) আশা করে, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ এবং সরকার শিল্পসম্পর্কের স্বাভাবিক-সাধারণ দিকগুলো দ্রুত অনুধাবন করতে পারবেন এবং দমনপীড়ন-সংঘাত বর্জন করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন। 

একটি দেশের ও জাতির মঙ্গলের জন্য শিল্প বিকাশে যেমন সহযোগিতা দিতে হবে, তেমনি শ্রমিকদেরও অধিকার আদায়ের সুযোগ দিতে হবে। শ্রমিক ছাঁটাইয়ে দেশে কর্মক্ষম বেকারে সংখ্যা বাড়ে, সরকারের ওপরে তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং সমাজ ও পরিবারের জন্য হয় ভীষণ ক্ষতিকর। অন্যদিকে শ্রমিকেরা যদি দরকষাকষির মাধ্যমে আয় ও সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়, তবে তা জাতীয় জীবনে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত করে। 

বাশি মনে করে, গত প্রায় ৩০ বছর ধরে রাষ্ট্রের তথা জনগণের প্রণোদনা, করছাড়া, ঋণসুবিধা, জমিজমাসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে বেড়ে ওঠা শিল্পখাতটির ওপরে আজ দায়িত্ব বর্তেছে দেশের জনগনের জন্য কল্যাণকর কিছু করা। লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে তাঁরা যে মহৎ কর্ম সাধন করেছেন, সেটি তখনই কলঙ্কিত হয়ে যায়, যখন নিযুক্তরা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরিটুকু পান না এবং সংগঠিত হয়ে কথা বলতে পারার অধিকার থেকে (ইউনিয়ন করার) বঞ্চিত হন।

আমরা চাই, (১) আজই কারখানাগুলো থেকে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ হোক এবং বরখাস্ত হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বহাল করা হোক, (২) শ্রমিকদের ও তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা তুলে নেওয়া হোক এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিনাশর্তে মুক্তি দেওয়া হোক, (৩) সরকার ও মালিক পক্ষ শ্রমিকদের ওপরে হয়রানি ও জুলুম না করার যে ওয়াদা করেছিলেন, তা পালন করুন, এবং (৪) প্রতিটি কারখানায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন চর্চার সুযোগ সুনিশ্চিত করা হোক। 


ধন্যবাদ,
শাহ্ আতিউল ইসলাম
সভাপতি, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)