বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে অন্তত পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় বাশির বিবৃতি
বিবৃতি | ২৩ এপ্রিল ২০২১ | ০৯:১৭
বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে অন্তত পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ
ও দুঃখিত। নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপরে গত ১৭ এপ্রিল, শনিবার, সকালে, এমন পুলিশী আক্রমণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের
জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, নিন্দনীয় ও হতাশাজনক। আমরা জেনেছি, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকেরা দশ-দফা দাবিতে আন্দোলন
করে আসছিল। গুলি না চালিয়ে, চলমান শ্রম অসন্তোষটি যাতে আলাপ-আলোচনা ও দরকষাকষির মধ্যদিয়ে একটি
সন্তোষজনক মীমাংসায় পৌঁছে সে চেষ্টা করাই ছিল প্রশাসন ও পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু তারা সেটা করতে সক্ষম
হননি। যা নিতান্ত পরিতাপের বিষয়।
শ্রমিকদের নিয়োজক কর্তৃপক্ষ, চীনা কোম্পানি সেফকো থ্রি পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড, যে দীর্ঘদিন
দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘন করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার না দিয়ে শ্রমিকদের কাজ করাচ্ছিল, সেটির
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও ছিল জরুরি। প্রায় ৭,০০০ শ্রমিকের এ কর্মক্ষেত্রটিতে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার
নেই, আইনস্বীকৃতি সাপ্তাহিক ছুটির দিন নেই, সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টাও মেনে চলা হত না, মাস শেষে মজুরি পড়ে থাকত
বকেয়া, বাসস্থান ছিল নোংরা-ময়লা এবং প্রতিবাদ করলেই চাকরিচ্যুত করা হত, যা অগণতান্ত্রিক ও অন্যায্য।
পুলিশ ও প্রশাসনের এটা মনে রাখা উচিত যে, তারা যদি নিয়োজকদের পক্ষ নেন বা কেবল তাদের স্বার্থরক্ষা করতে
উদ্যোগী হন, তবে তা প্রশাসন-পুলিশের মর্যাদাহানি করে, সুনাম নষ্ট করে এবং নিরপেক্ষতার শপথকে ক্ষুণœ করে।
এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ওই কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে শ্রমিকদের আইনী সুযোগসুবিধা বঞ্চিত করার ঘটনাটি
দেশের শিল্পসম্পর্ক ও শ্রম পরিস্থিতির জন্য এক কুৎসিত কলঙ্ক। যখন সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা-৮ অনুযায়ী
“সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন” করতে নানা কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়িত করে চলেছে, তখন শ্রমিকদের বঞ্চিত করে চলা এবং
তাদের আন্দোলনের ওপরে সহিংস আক্রমণ সরকারকে লক্ষ্য অর্জনে বঞ্চিত করার জন্য যথেষ্ট।
আমরা আরও উদ্বিগ্ন এটা দেখে যে, ঘটনার পর যে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাতে আসামী করা হয়েছে কেবল
শ্রমিকদের, যারা মূলত সহিংসতার বলি।
ঘটনা তদন্তে যে কমিটি দুটি গঠিত হয়েছে, তারা তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারবে কিনা, তা নিয়েও আমরা
উদ্বিগ্ন। কারণ ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গ্রামবাসীদের সাথে কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সহিংসতায় ২০১৬ সালেও অন্তত
চারজন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সে ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয়নি। এবার পাঁচজন নিহত হয়েছেন,
গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন প্রায় আরো ২০ জন। এবার আশা করছি, প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।
এর আগে, গত ১৬ মার্চ ২০২১ তারিখে তেজগাঁওয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপরে হঠাৎ গুলি চালায় পুলিশ। সে
ঘটনার সময় শ্রমিকেরা কারখানার অফিসারদের সাথে দাবিদাওয়া বিষয়ে আলাপ করছিলেন। গুলিতে অন্তত ৮জন
শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আহত হন আরো জনাবিশেক। দুই ঘটনার মিল দেখে আমরা আতঙ্কিত ও
উদ্বিগ্ন।
আমরা চাই, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত হোক। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন অবিলম্বে পরিশোধ করা
হোক এবং তাদের দাবিদাওয়ার একটি সন্তোষজনক মীমাংসা হোক। শ্রমিকদের পক্ষে মামলা দায়ের করুক সরকার। শ্রম

আইন লঙ্ঘন করে দেশী-বিদেশী নির্মাতারা কেন এতদিন কাজ করছিলেন, সে জন্য তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হওয়া
প্রয়োজন। ওই গ্রুপে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন চর্চার অধিকার বাস্তবায়িত হোক। ইউনিয়ন থাকলে হয়ত এ ধরনের
সহিংসতা খুব সহজেই এড়ানো যেত। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ দেওয়া হোক। মামলা ও হুমকি দিয়ে
শ্রমিকদের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে, তা ভীষণ অমানবিক এবং সে কারণে হয়রানি, গ্রেপ্তার ও হুমকি বন্ধ
হোক। এ জন্য পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারের উদ্যোগ জরুরি। অবাধ শ্রম আন্দোলনের অনুপস্থিতি কিভাবে শ্রমজীবী-
চাকরিজীবীদের বিপন্ন করে তোলে, এ ঘটনা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আমরা চাই, দেশের শ্রম আইন সংশোধন করে একে
সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক আইনে পরিণত করা হোক, যা সত্যিই শ্রমিকদের সুরক্ষা দেবে।

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)-র পক্ষে
গোলাম মুর্শেদ,
সদস্য, ট্রাস্টি বোর্ড