৮ বছরেও সাভারের প্রাণঘাতী কারখানা দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার না হওয়া আমাদের ‘জাতীয় কলঙ্ক’
বিবৃতি | ২৪ এপ্রিল ২০২১ | ০৪:৪২
বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)

একটি জাতি ও তাদের রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে, যখন
ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হওয়ার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার
সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুই হয় না? আট বছরে যে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়নি, সে মামলায় সুবিচার
পাওয়ার আশাও ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে। এ ঘটনায় আমরা হতাশ, লজ্জিত, ক্ষুব্ধ। দেশের এত
বড় ও শক্তিশালী আইন ব্যবস্থা ও প্রশাসন এতবড় হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের সাজা দিতে
প্রয়োজনীয় কর্মটুকু করতে পারবে না, এটা মেনে নেওয়া যায় না।
আমরা জানি, সাভারের কারখানা ধস একটি প্রক্রিয়াগত হত্যাকাণ্ড। যে প্রক্রিয়ায় জমি
জবরদখল করে, অবৈধ উপায়ে, ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত আইনের তোয়াক্কা না করে রানা প্লাজা
নামের ভবনটি তৈরি হয়েছিল এবং যে প্রক্রিয়ায় কর্মস্থলের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে,
শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া ও সংগঠন গড়ে তোলার সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত করে,
রাজনৈতিক ও স্থানীয় গুণ্ডাদের ব্যবহার করে, অবিবেচক, অদক্ষ ও অত্যাচারী ব্যবস্থাপনার
মাধ্যমে পাঁচটি কারখানা পরিচালিত হচ্ছিল, সে প্রক্রিয়াই শ্রমিকদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের কারণ।
অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে বাধ্য করার মাধ্যমে অন্তত ১১৩৬ শ্রমিককে মৃত্যু
এবং আরো ৪০০ শ্রমিককে স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেওয়ার ভয়াবহ ও নেক্কারজনক
ঘটনাটির পর আট বছর পেরিয়ে গেছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলে ভবনের নাজুক পরিস্থিতি এবং
সে অবস্থায় কাজ করতে শ্রমিকদের অনীহা ও বারংবার আপত্তিকে গ্রাহ্য করেনি মালিকপক্ষ।
বরং গুণ্ডাদের দিয়ে পিটিয়ে ও জোরজবরদস্তি করে শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকানো হয়েছিল। আর
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঘটেছিল হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও জখম হওয়ার ঘটনা।
ওই দুর্ঘটনার পর শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নানা দাবি ওঠে। সরকার ও মালিকপক্ষ এসব
দাবি মেনে নেওয়া হবে, বলে আশ্বাস দিয়েছিল। অথচ
* হাজার মৃত্যুর জন্য দায়ী কারখানা মালিক ও ভবন মালিকদের বিচার হয়নি
* ঘটনার পর দায়ের করা কোনো মামলারই নিষ্পত্তি হয়নি
* ঘটনাস্থল সরকার কর্তৃক পরিত্যাক্ত ঘোষিত হয়নি এবং সেখানে সর্বমহলের দাবি অনুযায়ী
নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী স্মৃতিমিনার
* সব কারখানায় সেফটি বা নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়নি
* কারখানা, মালিক ও শ্রমিকদের সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার চালু হয়নি
* প্রতি কর্মস্থলে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়নি
* ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত শ্রম আইনের ধারা সন্তোষজনকভাবে সংশোধিত হয়নি
* ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের ওপরে মালিকপক্ষ ও পুলিশের অত্যাচার বন্ধ হয়নি
আমরা মনে করি, ঠাণ্ডা মাথায় খুনের এ ঘটনার বিচার আজও হয়নি মালিকপক্ষের ষড়যন্ত্র এবং
সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণে। এ বিচারহীনতা প্রতিদিন বাংলাদেশের সাধারণ ও খেটেখাওয়া
নাগরিকদের শোষণ ও বঞ্চিত করার নতুন নতুন পথকে উৎসাহিত করে চলেছে। এত বড়
হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া বাংলাদেশের জন্য এক ‘জাতীয় কলঙ্ক’। এটা সম্ভব হচ্ছে, কারণ
এর আগে ঘটে যাওয়া সারাকা, লুসাকা, জাহানারা, সাংহাই, ম্যাক্রো, চৌধুরী, শান, গরীব এন্ড

গরীব, কেটিএস, স্পেকট্রাম, তাজনীন ফ্যাশনস, স্মার্টসহ আরো বহু কারখানা দুর্ঘটনায়
প্রাণহানির ঘটনার বিচার হয়নি। এ থেকে মুক্তির উপায় হলো প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে
যথাযথ শাস্তি দেওয়া, কারখানা প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং শ্রমিকদের ট্রেড
ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত করা।
২৪ এপ্রিলকে ‘জাতীয় শ্রমিক স্মরণ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এজন্য দিনটিকে
সরকারীভাবে পালন এবং কলকারখানা ও কর্মস্থলে ছুটি ঘোষণা করতে হবে, যাতে সেদিন
শ্রমিকেরা নানা অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করতে পারে এবং নিজেদের
কর্মস্থির করতে পারে।
আমরা মনে করি, দেশ ও জাতির কল্যাণে এখনই শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ও মতপ্রকাশের
অধিকার সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিক-কর্মচারীদের যথাযথ
ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও পুনর্বাসনের জন্য আইন ও গাইউলাইন থাকা আবশ্যক। আশা করি, শ্রমিক-
পেশাজীবীদের, অর্থাৎ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের, জীবন-জীবিকা নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করতে
সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনসমূহ আরো সাহসী, দায়িত্বশীল, উদ্যোগী ও আন্তরিক
ভূমিকা রাখবে।
ধন্যবাদ,
গোলাম মুর্শেদ
সদস্য, ট্রাস্টি বোর্ড,
বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)