খোলা চিঠি

দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে তাদের জীবন ও পেশার সংকট। প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এসবের সমাধান মিলছে না। ভঙ্গুর সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিকতার ধস এবং রাজনৈতিক কোন্দলে শ্রমিকেরা আরও বেশি করে পেঁচিয়ে যাচ্ছে। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকেরা কেবলই ভোক্তা। অথচ তারা যে মানুষ, তাদেরও যে ভোগ-সম্ভোগের প্রয়োজন আছে, এ সত্যটি বেমালুম চেপে যাওয়া হয়।

ধরে নেওয়া হয় শ্রমিকেরা যন্ত্র। তাদের নিজস্ব মতামত নেই। নীতিনির্ধারণ দূরের কথা, আশপাশের সমস্যাবলি সমাধান করতেও তারা অক্ষম। কিন্তু তাদের জড় পদার্থ বিবেচনার নীতিটি পুরো সমাজকেই অমানবিক করে তুলেছে। কারণ তারাই সমাজের শতকরা ৯০ ভাগ। দেখা যাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে ইউনিয়ন চালু না থাকায়, শ্রমিকেরা সবাই মিলে নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধা করতে পারছে না। যা সহজেই করা যেত, তা জট পাকিয়ে যাচ্ছে। মজুরি পেতে দেরি হলে, কারখানায় মারধরের শিকার হলে, হঠাৎ কারখানা বন্ধ ঘোষণা হলে, ক্ষোভ প্রশমনের নিয়মতান্ত্রিক উপায় না পেয়ে, শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে ভাঙচুর করছে। সঠিক সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক শিক্ষার অভাবে শ্রমিকেরা হয়ে উঠছে বেয়াড়া-বেপরোয়া। অনিরাপদ-অমানবিক কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের নাভিশ্বাস উঠছে। পুরো শ্রমিক সমাজ যেন হতাশ, সহিংস ও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছে।

বেশিরভাগ শ্রমিক বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি পাচ্ছে না। অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েও পেটের দায়ে মুখ চেপে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ও দ্রব্যের দাম বেড়ে চলেছে, ওদিকে বাড়িওয়ালাদের হম্বিতম্বির শেষ দেখা যাচ্ছে না। মাস শেষে যে অল্প ক’টি টাকা হাতে আসে, তার বড় অংশই চলে যায় কর-মূসক হিসেবে সরকারের কোষাগারে। কিন্তু সরকার শ্রমিকদের দিকে চেয়েও দেখে না। তারা ভবন ধসে মরে গেলেও নয়, আগুনে পুড়ে পঙ্গু হয়ে গেলেও নয়।

‘শ্রমিকদের জন্য হ্যান কারেঙ্গা, ত্যান কারেঙ্গা’ এমন কথা সব সরকারই বলে আসছে। কিন্তু কাজের বেলায় সব ঠন ঠন। শ্রমিকদের দেওয়া করের টাকা হরিলুট করা হচ্ছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা (কার্যত নগদ অর্থ) দেওয়ার এক কিম্ভুতকিমাকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে সরকার। কোটিপতিদের যেসব ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারছে না, সেগুলোকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। ওই টাকা আসছে জনগণের কর-মূসকের টাকা থেকে। অথচ শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা বা চিকিৎসার দাবি তুললে, সরকার বলছে ‘হাত ফাঁকা। নিজেরা করে নাও। সবকিছুর দায়িত্ব সরকার নিতে পারবে না।’

শ্রমিকদের দমন করতে শিল্প পুলিশ আইন পাস হলে তা বাস্তবায়ন করতে দুদিনও সময় লাগে না। কিন্তু স্বাধীনতার পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আইন প্রণীত হয়নি। বহু আন্দোলন সংগ্রামের পর শ্রম আইন পাস হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার সময় তা কার্যকর থাকে না। কেবল শ্রমিকদের ওপর জোরজুলুম চালানোর জন্য আইন খাটানো হচ্ছে। নিয়োজকদের চাহিদা মতো আইনের পরিবর্তন হচ্ছে, অথচ শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর স্বীকৃতি মিলছে না। এদেশে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়, বাস্তবায়িত হয় না। শ্রমিকদের ক্ষুদ্র এক অংশকে দেওয়া হচ্ছে পে-স্কেল, আরেক অংশের জন্য আছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। অথচ ৯০ শতাংশ শ্রমিকের জন্য আজও কোনো নিয়ম-নীতি নেই। শ্রমিকদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য যে আইনের প্রয়োগ হয়, তা শ্রমিকদের চাকরি পাকা করার জন্য প্রযোজ্য হয় না। এ এক অদ্ভুত ভেল্কিবাজি। দেশের আর সব আইন অমান্য করলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে, কিন্তু শ্রম আইন ভাঙলে মালিকদের গায়ে টোকাটিও পড়ে না। এমন বৈষম্যমূলক সমাজ আজকের দুনিয়াতে বিরল।

শিল্প উদ্যোক্তা বা নিয়োজকদের জন্য সরকার খাস জমির ওপরে বিশেষ শিল্পাঞ্চল [স্পেশাল প্রোসেসিং জোন (ইপিজেড)/ স্পেশাল ইকোনমিক জোন (সেজ)] করে দিচ্ছে। স্বাধীনতার আগে কথা ছিল, সব খাস জমি ভূমিহীন চাষিদের মাঝে বণ্টন করা হবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কৃষকের ভাগে জমি জোটেনি, জুটেছে বঞ্চনা। লাখ লাখ একর খাস জমি কোটিপটিতরা দখল করে নিচ্ছে, কিন্তু গরিব শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা সরকার করছে না। ইদানীং শ্রমিকদের নিয়ে বড় বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে। বলা হচ্ছে তারা দেশের সম্পদ, মা-বাবা, বেয়াই-বোনাই-জগাই-মাধাই সব। কিন্তু শ্রমিকদের শ্রম ও মেধার সত্যিকার স্বীকৃতি দেওয়ার অভিপ্রায় কারোর নেই। অধিকাংশ শ্রমিক যে ‘দশ ফুট বাই দশ ফুট’ ঘরে পরিবার-পরিজনসহ মানবেতর জীবনযাপন করে, তা জানার পরও তাদের আবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। শ্রমিকেরা যে না খেয়ে অপুষ্টিতে ভুগে অল্প বয়সে রোগে ভুগে মারা যায়, তা জেনেও নিয়োজকেরা তাদের জন্য ভালো খাবারের বন্দোবস্ত করে না। শ্রমিকদের কেবল শ্রম টুকুই নয়, তাদের পুরো সত্তা, এমনকি স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকেও মালিকেরা নিজেদের সম্পত্তি বলে মনে করে। ভাবখানা এমন যে, শ্রমিকেরা নির্লজ্জ-বেহায়া-খবিশ, মালিকদের ‘কেনা দাস’!

এ দেশের কারখানা মালিক আর সরকার দারুণ এক মানিকজোড়। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এখানে যেন সব শেয়ালের এক রা। শ্রমিকেরা বকেয়া বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করলে এই ‘শেয়ালেরা’ বলে শ্রমিকেরা নাকি ‘বিদেশি চক্রান্তকারীদের’ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে’। আরো বলা হয় : শ্রমিকদের দারুণ লোভ, খালি টাকা-টাকা করে। অথচ এ মুল্লুকের সবাই জানে কাদের কিসের লোভ। সরকার আর নিয়োজকদের জেনে রাখা দরকার, শ্রমিকেরা লড়ে মর্যাদা বাঁচাতে। দুটো টাকার লোভে নয়। ওই ধরনের প্রচুর টাকা যে মালিকেরা প্রতিদিন শ্রমিকদের ভাগ থেকে চুরি করে বড়াই করছে, তা অর্থনীতিবিদেরা বহু আগেই হিসাব কষে দেখিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু কিছু কিছু অজ্ঞতা শ্রমিকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর দায় শ্রমিকদেরই, যদিও তারা পুরোপুরি দায়ী নয়। প্রযুক্তি বিষয়ে জানাশোনার অভাব শ্রমিকদের জন্য নতুন মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প-কৃষি ও সেবা খাতের অধিকাংশ কাজই এখন প্রযুক্তিনির্ভর। মানে কেবল দুটো হাত, দুটো পা আর একটি মাথা থাকলেই হচ্ছে না। শ্রমিকদের মাথায় কিছু বেশি বুদ্ধি-বিবেচনাও থাকতে হচ্ছে। নতুন সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতি চালাতে না পারলে চলছে না। বহু শ্রমিক মাঝ বয়সে গিয়ে হঠাৎ বেকার হয়ে পড়ছে। ওই বয়সে তাদের নতুন করে পড়ালেখার বা শেখার আগ্রহ থাকে কম। আর নিয়োজকেরা তো দায় এড়াতে পারলেই বাঁচে! শ্রমিকদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নিয়োজকদেরই। কিন্তু আমাদের মতো সস্তা শ্রমের দেশে সে দায়িত্বটি তারা নেবে না। উল্টো হম্বিতম্বি করবে! বলবে : ‘তুমি অদক্ষ শ্রমিক, তোমার কাজ নেই। বের হও!’

তাহলে শ্রমিকদের মুক্তির উপায় কী? শ্রমিকেরা যদি কোনো গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ইউনিয়নের সদস্য হতো, তবে সেখানেই বিনা পয়সায় তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত। এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ইউনিয়নগুলো এসব কাজ করছে। আজ থেকে ২০০ বছর আগে ইউনিয়নগুলোর কাজের যে পরিমণ্ডল ছিল, তা আজ শতগুণ বেড়েছে। ১৮৩০-এর দিকে জন ডোহার্টি বা রবার্ট ওয়েনেরা যে ধরনের ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজ বড্ড সেকেলে। এমনকি লেনিন-ট্রটস্কিরা যে ধরনের ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, সেগুলোও আজকের যুগে অচল। বরং এখনকার ইউনিয়নকে হতে হয় অনেক গতিশীল, বহুমুখী। তা না হলে, সেগুলো হয় নিয়োজকদের পকেটে ঢুকে যাবে, নয়তো শ্রমিকদের শোষণের নতুন বাহিনী হিসেবে দেখা দেবে। চারদিকে এমন উদাহরণের অভাব নেই। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে বিভ্রান্ত ও বিপথে চালিত করতে অনেকগুলো রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জারি আছে। শ্রমিকদের শত্রুরাই কেবল নয়, শ্রমিকদের বন্ধুত্বের দাবিদার কিছু সংগঠনও এসব ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকে। এসব প্রক্রিয়ার ধরন মোটামুটি তিনটি।

প্রথমটি হলো : ইউনিয়নের প্রথম সারির নেতাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজের অভিযোগ তুলে শুরুতেই তাদের বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় এবং এসব মিথ্যা অভিযোগে নেতাদের জেলে পুরে হয় হত্যা করা হয়, নয়তো ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলা হয়। দ্বিতীয়টি হলো : শুরুতে কাঁচা টাকা-যৌনতা-মাদক ইত্যাদি দিয়ে নেতাদের নৈতিকতা নষ্ট করে দেয়া হয়। নেতাদের দুর্বল নৈতিকতার সুযোগ নিয়ে এরপর ইউনিয়নের ভেতরে অসন্তোষ বা দলাদলি সৃষ্টি করা হয়। সংকট প্রকট হয়ে উঠলে ইউনিয়নের সংগঠকদের ঘুষ-দুর্নীতিতে ডুবে যেতে একরকম বাধ্য করা হয়। তারপর তাদের ‘বদনাম’ দিয়ে ইউনিয়ন ও নেতৃত্ব দুটিকেই দুর্বল করে দেয়া হয়। তৃতীয় প্রক্রিয়াটি ঘটে রাজনৈতিক দলের পৃষ্টপোষতায়। শুরুতে কোনো না কোনো কৌশলে শ্রমিক নেতাদের আর্থিকভাবে দলের ওপরে নির্ভরশীল করে ফেলা হয়। এরপর ‘দলের জন্য পুরো সময় কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে’ প্রতি মাস বা সপ্তাহে খুব কম পরিমাণ অর্থ দেয়া হয় এসব নেতাদের। তীব্র অর্থাভাবে অল্প কিছুদিন পরই নেতাদের নৈতিকতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন তারা ধার-দেনা করা থেকে শুরু করে ছোট-বড় নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এরপর যা ঘটে, তা ওপরেই বলা হয়েছে।

এসব প্রক্রিয়া সফল হবার কারণে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড ইউনিয়নগুলো এখন শোষক-নিপীড়কদের লেজ হয়ে ঝুলে আছে। এগুলো আজ সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট আর শ্রমিক শোষণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। আর বেসরকারি খাতের ইউনিয়নগুলো আছে মহাবিপদে। অধিকাংশের কমিটি গঠিত হয় বাছাই করা ব্যক্তিদের নিয়ে, নির্বাচনের মাধ্যমে নয়। ওইসব ইউনিয়ন বা ফেডারেশনে হয় মালিকপক্ষ, নয়তো শ্রমিকদের একাংশ ‘রাজা-উজির মেরে’, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে পায়ে মাড়িয়ে এবং পছন্দের লোকেদের নিয়ে কমিটি বানায়। অবশ্য এমন অনেক ইউনিয়নও আছে, যেগুলোতে নিয়মিত নির্বাচন ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব ইউনিয়ন শ্রমিকদের স্বার্থে লড়ে যাচ্ছে।

নিবন্ধিত ইউনিয়নগুলো ছাড়াও শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করছে এমন বহু শ্রমিক ফেডারেশন ও রাজনৈতিক সংগঠন আছে। দেশের সবগুলো অর্থাৎ শতভাগ শ্রমিক সংগঠনের প্রধান কয়েকটি দাবি একই রকম: ১. সব কর্মস্থলে ইউনিয়নের অধিকার চাই, ২. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি চাই, ৩. নিরাপদ কর্মপরিবেশ চাই এবং ৪. দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ নয়। এসবের বাইরে মাতৃত্বকালীন ছুটি, গণতান্ত্রিক শ্রম আইন, শ্রমিকদের আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও সবার অবস্থান অভিন্ন। তবুও কেন যে এই শত শত ফেডারেশনের মধ্যে দাবিভিত্তিক ঐক্য গড়ে ওঠেনি, সেটা বোঝা খুব কঠিন। বছরের একটি দিন শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়। সবাই সেদিন ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগান দেয়। অথচ ওই দিন সব ফেডারেশন মিলেমিশে অনুষ্ঠান করতে পারে না!

এসব ফেডারেশনের অধিকাংশই নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার হুমকি মোকাবিলায় অক্ষম। নিয়োজকদের নিয়ন্ত্রণাধীন আইন, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার বিপরীতে ওইসব পায়াভারি শ্রমিক সংগঠনের প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। কর্মস্থলে নিয়োজকের পক্ষের প্রশাসন হলো মানবসম্পদ, প্রশাসন, হিসাব বিভাগ ইত্যাদি। শ্রমিক পক্ষের প্রশাসন হলো ইউনিয়ন। প্রশাসন চালাতে নিয়োজকেরা যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত লোকেদের নিয়োগ দেয়, তেমনি ইউনিয়ন চালাতে যোগ্য ও দক্ষ নেতা গড়ে তুলতে হবে। অথচ দেশের বেশিরভাগ ইউনিয়ন বা ফেডারেশনে এমন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান নয়। শ্রম আইনের খুঁটিনাটি, মজুরি হিসাবের পদ্ধতি, কারখানার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োজকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী তা ইউনিয়ন সংগঠকদের ভালোভাবে জানা দরকার। এজন্য তাদের প্রস্তুত করার দায়িত্ব ফেডারেশন বা ইউনিয়নগুলোর। হয়তো সংগঠনগুলো চেষ্টা করে, কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে, অর্থাৎ বইপুস্তক, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির অপ্রতুলতার কারণে, লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয় না।

শ্রমিকদের আরও কিছু সংকট আছে—তা তাদের সত্তাকে ঘিরে। সারাজীবন তারা অন্যের নির্দেশ মতো কাজ করে। তাদের ব্যাপারে নীতি গ্রহণ করে অন্যেরা। বাস্তবায়নও করে অন্যেরা। তাই তারা চায় জীবনের নিয়ন্ত্রক বা নিয়ন্তা হতে। কিন্তু পারে না। নিজের কাজ করতে গিয়ে হয়তো ছোটখাট সিদ্ধান্ত তারা নেয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ নগণ্য। ফলে এক সময় নিজের উৎপাদিত পণ্য বা সেবার সঙ্গে তাদের মানসিক যোগ থাকে না। তীব্র যন্ত্রণাময় বিচ্ছিন্নতায় ভোগে প্রতিটি শ্রমিক। আরেকটি সংকট হলো, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চাকরির বাজারে শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত একে অপরের সঙ্গে নিজেদের অজান্তে লড়ে চলেছে। এ বিষয়টি তাদের বিরোধ ও বিচ্ছিন্নতাকে সবসময় বাড়িয়ে তুলতে চায়। তাই ঐক্যের ডাক দিয়ে এ বিচ্ছিন্নতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।

শ্রমিক সত্তা বিষয়ে সামাজিক ধারণাও কম বড় সংকট নয়। সমাজে এ ধারণা সুপ্ত হলেও বেশ প্রবল যে, শ্রমিকেরা মানুষ হিসেবে মর্যাদা পেতে পারে না। শ্রমিকেরা স্বল্প বেতন পেলেও অনেকে মনে করে, শ্রমিক হিসেবে তারা অনেক বেশি বেতন পাচ্ছে। অনেকে মানতেই পরে না যে, শ্রমিকেরা ফোন, ইন্টারনেট, ফ্রিজ, গাড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করবে। যেন গরিব হয়ে থাকাই শ্রমিকদের নিয়তি! আর তাই দেশের বহু সামরিক-অসামরিক আমলা, মন্ত্রী বা ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার দুর্নীতি দেখে অনেকে কষ্ট না পেলেও, ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সামান্য দোষ দেখে তারা ‘হা-হা’ করে উঠে। শ্রমিক নেতারা অপরাধ করলে তাদের নিশ্চয়ই সাজা হওয়া উচিত। কিন্তু সমাজের রাঘব-বোয়ালদের ছেড়ে দিয়ে কেবল শ্রমিকদের শাস্তি দেওয়া হলে সামাজিক বৈষম্যের অভিযোগ উঠতে বাধ্য।

আরেকটি সংকট হলো : অধীনতা। শ্রমিকেরা যত বড় পদেই কাজ করুক না কেন, তাদের কারো না কারোর অধীন হতেই হয়। তাদের মধ্যে যারা সচেতন নয়, অর্থাৎ যারা শ্রমের মর্যাদা, আত্মসম্মানবোধ ও অধিকারের বিষয়টি বুঝতে পারে না, তারা হীনমন্যতায় ভুগে। অবশ্য এ জন্য নিয়োজকদের ‘বিরতিহীন কেত্তন’ও কম দায়ী নয়। মালিকেরা তো ইদানীং দাবিই করে বসে যে, তারাই নাকি শ্রমিকদের দয়া করে খাইয়ে-পরিয়ে রেখেছে। তারা বলে ‘প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে মনে করো’, ‘প্রতিষ্ঠানকে নিজ দায়িত্বের বাইরে বেশি কিছু দিতে না পারলে প্রতিষ্ঠান কেন তোমার দিকে তাকাবে?’ বুঝুন ঠেলা! এখন নাকি নিজের দায়িত্বটুকু পালনের পরও বেশি কিছু দিতে হবে! এ হলো দয়া দেখানোর নমুনা! আসলে এসব হলো শ্রমিকদের শোষণ ও নির্যাতনের পরিশীলিত পদ্ধতি। মালিকপক্ষের লোকেদের এসব কথায় কান দিলে আর নিজের অধিকারের ব্যাপারে অসচেতন থাকলে, হীনমন্যতায় ভোগা ছাড়া আর কোনো উপায় তাদের থাকে না। অধীনতা ছাড়াও আরেকটি বিষয়ে শ্রমিকদের হীনমন্যতায় ভোগায়। সেটি দারিদ্র্য। এটি নির্মূল হওয়া সবচেয়ে জরুরি। তবে সব সংকট থেকে শ্রমিকদের মুক্তির বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে পুরো উৎপাদন কাঠামো পরিবর্তনের ওপরে।

প্রতিকূল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো যে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের বৈপ্লবিক চেতনারই প্রকাশ। এসব আন্দোলনের বদৌলতে দেশের শ্রমিকদের অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। বেশ কিছু দাবিদাওয়া আদায় করা সম্ভব হয়েছে। শ্রমিকেরা যে নিত্য প্রতারিত হচ্ছে, তাও দেশবাসীর নজরে আনা গেছে। কায়িক শ্রমিকদের জন্য খুব বেশি কিছু করা না গেলেও, মানসিক শ্রমিকদের রোজগার অনেক বেড়েছে। প্রকৌশলী, ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, পুলিশ বা হিসাবরক্ষকদের মতো মানসিক শ্রমিকদের অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। এরা কেবল বেশি বেতনই পাচ্ছে এমন নয়; ধর্মঘটের অধিকার, পেনশন, গ্রাচ্যুইটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিনোদন ছুটির মতো বিশেষ সুবিধাও নিয়মিতভাবে ভোগ করছে। অনেক খাতের কায়িক শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে মজুরি কাঠামো নির্দিষ্ট করা গেছে।

শ্রমিকদের সব সমস্যার সমাধান না হোক, তাদের ‘মানবিক জীবনযাপনের’ ব্যবস্থা করা খুব কঠিন নয়। এ জন্য চাই (১) শিল্প-কৃষি ও সেবা খাতের কায়িক-মানসিক সব শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস, (২) শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন, (৩) রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছা, (৪) গণমাধ্যমের ইতিবাচক সহযোগিতা এবং (৫) রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন শ্রমিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগ।

সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের প্রথম দায়িত্ব বর্তায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ওপরে। এরপর থাকে শিল্প ইউনিয়ন, পেশাভিত্তিক ইউনিয়ন এবং জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলো। অথচ এসব সংগঠনের সীমাবদ্ধতা, অদক্ষতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে শ্রমিক আন্দোলন খুব বেশি এগুতে পারছে না। এ ছাড়া সংগঠনগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, গণতন্ত্র চর্চা ও শিক্ষাবিস্তার কার্যক্রমের অনুপস্থিতি, আইনি সহায়তার ঘাটতি এবং তাত্ত্বিক-আর্থিক পরনির্ভরশীলতা শক্তিশালী আন্দোলনের পথে বিরাট বাধা।

দেশের শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কর্পোরেট দুনিয়ার দেখানো রঙিন স্বপ্নে বিভোর বলে, তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট খুব প্রবল। এরা ‘শ্রমিক’ বলে পরিচয় দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে। অপরদিকে, শাসকশ্রেণি সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে শ্রমিকদের এমনভাবে বিভক্ত করেছে যে, ঐক্য করা মুশকিল হয়ে গেছে। “শ্রমিকদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন”-এ সহজ কথাটি সহজে বোঝানো যাচ্ছে না। এদিকে সঠিক কৌশলের অভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপরে প্রভাব তৈরি করাও সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া দেশে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনার ব্যাপ্তি খুব কম। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ বা চর্চার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। শ্রম খাত নিয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার শূন্যতা আরও লক্ষণীয়।

এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক ঐক্যকে উৎসাহিত করা, সংগঠনগুলোকে প্রয়োজনীয় রসদ জোগানো এবং শ্রমিক স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা দরকার। মুক্তি সংগ্রামে শ্রমিকদের ‘মানবিক দায়িত্বের’ বিষয়টিও সঠিকভাবে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। শ্রমিকেরা অত্যাচারিত-বঞ্চিত। তাই তাদের যেমন নিজেদের মুক্ত করতে হয়, তেমনি মুক্ত করতে হয় অত্যাচারীদেরও। যে ব্যবস্থার কারণে অত্যাচারীরা ‘অত্যাচারী’ হয়ে ওঠে বা ‘অত্যাচার’ না চালিয়ে থাকতে পারে না, সে ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত করা ছাড়া শ্রমিকদের চূড়ান্ত মুক্তি নেই। সেটি বিলুপ্তির লক্ষ্য ঠিক না থাকলে, সমাজের ছোট যে অংশটি প্রথমে অত্যাচার-বঞ্চনা থেকে মুক্ত হবে, তা অচিরেই নির্যাতক বনে যাবে। এ শিক্ষা মিলেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস থেকে।

এমন স্বপ্ন দেখা যেতেই পরে : একদিন শ্রমিকেরা নির্যাতন-নিপীড়ন-হীনতা-দৈন্যতা থেকে মুক্তি পাবে। সব শ্রমিকের সুন্দর বাড়িগাড়ি থাকবে, তাদের শিশুরা আর সব শিশুদের মতো স্কুলে যাবে, স্বাস্থ্যসেবা পাবে, শ্রমিকেরা দাস নয় মানুষ বলে বিবেচিত হবে।

শ্রমজীবী মানুষদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে সমাজকে অশিক্ষা-দারিদ্র্য-বৈষম্য ও যুদ্ধমুক্ত করতে চায় বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট। এর কৌশলী ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন একাগ্রতা, পরিশ্রম ও বিপুল অর্থ। এ সংগঠন বিশ্বাস করে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেকোনো ভালো উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে। এ বিশ্বাস থেকেই আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাইছি। পুরো সমাজকে আরও বেশি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ করে তুলতে আপনারা এগিয়ে আসবেন, এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।