প্রশ্নোত্তর

০১. বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) কী?

০২. বাশি কেন শ্রমিকদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করাকে প্রাথমিক কাজ বলে মনে করে?

০৩. শ্রম ইনস্টিটিউট কেন প্রয়োজন?

০৪. বাশি কীভাবে পরিচালিত হয়?

০৫. বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের অর্থের উৎস কী?

০৬. বাশির তৎপরতা কি সব শ্রমিকদের জন্য কল্যাণকর?

০৭. বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের কাজে গণতান্ত্রিকতা কীভাবে নিশ্চিত হয়?

০৮. বাশি কি সুনির্দিষ্ট কোনো মতবাদে বিশ্বাসী?

০৯. বাশি কি এনজিও, নাকি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন?

১০. বাশি কি সংগ্রামের নির্দিষ্ট মডেল আরোপ করতে চায়?

১১. বাশিতে তরুণেরা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

১২. একজন প্রযুক্তিবিদ বা শিল্পী কীভাবে বাশিতে কাজ করতে পারেন?

১৩. ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলো থাকবার পরও শ্রম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?

১৪. বাশির সহযোগী সংগঠন হওয়ার সুবিধা কী?

১৫. বাশির সহযোগী হওয়ার নিয়ম কী?

১৬. নিয়োজক-শ্রমিক সর্ম্পককে বাশি কীভাবে দেখে?

১৭. বাশির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কী?

১৮. বাশির আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হয়?

১৯. শ্রমিক আন্দোলন বিকাশের প্রশ্নে বাশি বিভিন্ন পরিবেশবাদী, নারীবাদী, সংখ্যালঘু বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখে?

২০. বাশি কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

২১. বাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রাথমিক স্কুল বা শ্রমিকদের জন্য নৈশ স্কুল স্থাপন করতে তেমন আগ্রহী নয় কেন?

২২. বাশি হাসপাতাল তৈরি করতে চায় কেন?

২৩. বাশি কেন সংগ্রহশালা তৈরি করতে চায়?

২৪. বিদ্যমান কৃষক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিষয়ে বাশির অবস্থান কী?

২৫. বাশি যা যা করতে চায়, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অধীনস্ত শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলো কী তা করতে অক্ষম?

২৬. শিশুদের জন্য বাশির কর্মসূচি নেওয়ার কারণ কী?

২৭. নারীদের জন্য বাশির বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার কারণ কী?

২৮. সংগঠনে ব্যক্তির ভূমিকা প্রশ্নে বাশির অবস্থান কী?

২৯. নারী-পুরুষ সম্পর্কের ব্যাপারে বাশির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

৩০. ধর্ম প্রশ্নে বাশির অবস্থান কী?

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) কী?

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) ‘ট্রাস্ট আইনে’ নিবন্ধিত একটি শ্রমকল্যাণ প্রতিষ্ঠান। কর্মস্থলে ও বাইরে শ্রমিকেরা যাতে একটি মানবিক ও উন্নত জীবনযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করে বাশি। এ জন্য শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বাজার, সরকারসহ নীতিনির্ধারণী মহলের সর্বত্র শ্রমিকদের পক্ষে হয়ে তৎপরতা চালায় এ সংগঠন। শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় শ্রম ও শিল্প বিষয়ে গবেষণা; শ্রমিক আন্দোলনকে বেগবান করতে ট্রেড ইউনিয়ন ও সংগঠনগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য-তত্ত্ব জোগান দেওয়া এবং শ্রমিকদের কল্যাণে শিক্ষালয়, গবেষণাগার, ব্যায়ামাগার, হাসপাতাল, মহাফেজখানা, পাঠাগার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা এর নিয়মিত কার্যক্রম।

‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার কাজ, প্রতি কর্মস্থলে ট্রেড ইউনিয়ন, আদর্শ কর্মপরিবেশ এবং সব শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য একক ও গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন’ গড়ে তোলার সব প্রচেষ্টার প্রতি রয়েছে বাশির শর্তহীন সমর্থন ও সহযোগিতা। এ লক্ষ্যে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, আলোচনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আছে বাশির। বই-পুস্তক, লিফলেট, ভাঁজপত্র প্রকাশের পাশাপাশি একটি অনলাইন পত্রিকাও চালায় বাশি। শ্রম, শ্রমিক ও শিল্প সম্পর্কিত বিভিন্ন খবরের সঙ্গে প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ পরিবেশিত হয় পত্রিকাটিতে।

বাশি ঐক্য ও যৌথতায় বিশ্বাসী। ব্যক্তিসর্বস্বতার বদলে যৌথ নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং শ্রমিক, তাদের পরিবার ও সজ্জনদের একতাবদ্ধ করা বাশির লক্ষ্য। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বাশি বিভিন্ন সহযোগী ও সমমনা সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে।

নয়াউদারবাদী যুগে শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পেশাগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। এসব বাধা অতিক্রমের জন্য শ্রমিকদের দরকার হয় নতুন কৌশল ও আয়োজনের। অনুন্নত দেশের কায়িক শ্রমিকেরা যে পরিমাণে শোষিত-অত্যাচারিত হয় এবং যেভাবে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, তাতে তারা সময়ের সাথে সাথে তালমিলিয়ে নতুন কৌশল তৈরি এবং তা অনুযায়ী কর্মসূচি গ্রহণের অবকাশ পায় না। একপর্যায়ে তারা কাজ হারিয়ে, মর্যাদা খুঁইয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকে। এজন্য বাশি শ্রমিকদের ওইসব সহযোগিতা দিয়ে থাকে, যা তারা সময় বা দক্ষতার অভাবে আয়োজন করতে পারে না।

শ্রমিকদের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাশি বিভিন্ন শ্রম সংস্থা, ইউনিয়ন, ফেডারেশন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চিন্তা ও কাজের নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলে। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার, আন্তর্জাতিকমহল, রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন, শিল্পোদ্যক্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরে বাশি এমনভাবে চাপ তৈরি করে, যাতে তারা শ্রমিক কল্যাণে কর্মসূচি গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য হয়।

বাশি কেন শ্রমিকদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করাকে প্রাথমিক কাজ বলে মনে করে?

শ্রমিক ও তাদের পরিবারবর্গ দেশের মোট জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় অংশ। প্রায় ৯০ শতাংশ। শ্রমিকেরা সংগঠিত হয় মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য। দরকষাকষি, প্রতিবাদ, ধর্মঘট, আন্দোলন, সংগ্রাম ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে শ্রমিকেরা যেসব অধিকার আদায় করে, তা তাদের জীবনের মানকে উন্নত করে। ধীরে ধীরে শ্রমিকেরা দারিদ্র্য-শোষণমুক্ত সচ্ছল জীবনযাপন করার সুযোগ পায়।

দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাপনের মান উন্নত হওয়ার অর্থ হলো দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন। শ্রমিকেরা শিক্ষিত ও সচেতন হলে পুরো সমাজেই তার ছাপ পড়ে। আইন ও অধিকার বিষয়ে সচেতন হলে শ্রমিকদের মধ্যে যেমন আত্মসম্মানবোধ, সৌহার্দ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়, তেমনি সমাজে অপরাধ প্রবণতাও অনেক কমে যায়।

শ্রমিকেরা যদি গণতান্ত্রিক অধিকার অর্থাৎ স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়া এবং নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পায় এবং নিজেদের সংগঠনে গণতান্ত্রিক চর্চা করতে অভ্যস্ত হয়, তবে পুরো দেশে সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন অনেক সমস্যা সহজেই সমাধা করা যাবে।

শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবিদার সংগঠনগুলোর জন্যও শ্রমিকদের সংগঠিত করা জরুরি। শ্রমিকদের মধ্য থেকে যোগ্য ও যৌথ নেতৃত্ব গড়ে না উঠলে, তাদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা পুরোপুরি অসম্ভব।

শ্রম ইনস্টিটিউট কেন প্রয়োজন?

ব্রিটেনে ১৮৩০-এর আশপাশে জন ডোহার্টি ও বরার্ট ওয়েনেরা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন। এরপর প্রায় ২০০ বছর হতে চলল। এত দিনে শ্রমিকেরা কেবল মজুরি ও ছুটির অধিকার আদায় করেই ক্ষান্ত হয়নি, নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাহসও দেখিয়েছে। নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার, নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার দাপট এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ শ্রমিকদের কিছু মুক্তি নিশ্চিত করেছে; অনেক ক্ষেত্রে গড়ে তুলেছে প্রতিবন্ধকতাও। এছাড়া মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্যোগ—যেমন: অনিরাপদ খাদ্য, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ইত্যাদি—শ্রমজীবী মানুষকে অমানবিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের লক্ষ্য হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক-শ্রমিকদের বিপন্ন করে করপোরেট ও পুঁজির মালিকদের অর্থবিত্তের বিকাশ নিশ্চিত করা।

এমন পরিস্থিতিতে শ্রমজীবী নারী-পুরুষের জন্য কেবল ‘ভালো’ কিছু করতে চাওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবি আদায়ে ইউনিয়ন-ফেডারেশন-দল গড়ার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে অপরিহার্য হয়ে। শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশে দর্শন, অর্থনীতি, ইতিহাস, গণিত, প্রকৌশলবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের মতো বহু বিষয়ের অধ্যয়ন ও অনুশীলন আজ অপরিহার্য।

ইউনিয়ন সংগঠক ও অধিকার দাবি করা শ্রমিকদের ওপরে নিয়োজকদের নির্যাতন এবং তাতে রাষ্ট্রের নীরব সমর্থন—অনেকক্ষেত্রে সহযোগিতা—এটাই প্রমাণ করে যে, শ্রমিকদের রক্ষার জন্য মানবিক ও আইনি সহায়তা একান্ত প্রয়োজন। বছর বছর নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব বলছে, আজীবন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন না থাকলে দক্ষতার অভাবে বহু শ্রমিক অচিরেই বেকার হয়ে পড়বে, যা তাদের দরিদ্র জীবনকে মানবেতর করে তুলবে। রোজগারের টাকা যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংস্থান করতেই ফুরিয়ে যায়, সঞ্চয়ের অবকাশ আর থাকে না, তখন বোঝা যায়, বুড়ো বয়সে চিকিৎসা, খাবার বা বাসস্থানের জন্য শ্রমিকদের হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

এসব মুশকিল আসানের জন্য বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের (বাশি) প্রতিষ্ঠা। একাধারে অধ্যয়ন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন এবং শ্রমিকদের মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বা অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এ সংস্থার যাত্রা শুরু।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শ্রমিকেরা আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক চেতনার প্রভাবে বহু দল-উপদলে বিভক্ত। অভিন্ন অর্থনীতিবাদী স্বার্থ ও মানবিক সংকট তাদের একত্রিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা কেউ ‘শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবিদার পার্টিগুলোর’ অধীন, কেউ পুঁজিপন্থী বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর হাতের পুতুল, কেউ বা আবার নৈরাজ্যবাদী সংগঠনগুলোর নিবেদিত কর্মী। অথচ নিয়োজকেরা সক্রিয়, সুসংগঠিত ও সুদক্ষ।

রাজনৈতিক মতাদর্শের দোহাই পেড়ে শ্রমিকদের এভাবে বহুবিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন রাখায়, নিয়োজকেরা জিতে গেছে সহজে—শ্রমিকেরা রয়ে গেছে শোষিত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত। তাই ঐক্য এখানে জয়ের পূর্বশর্ত। শ্রমিক ও তাদের সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সব প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের পাশে আছে বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি)। একা একা নয়, বাশি কাজ করতে চায় অন্যান্য শ্রমিকবান্ধব সংগঠনকে সাথে নিয়ে। হোক তা বই প্রকাশ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন। শত বিভক্তির পথ এড়িয়ে শ্রম সংগঠনগুলোর নিরপেক্ষ মঞ্চ হিসেবে কাজ করতে চায় বাশি।

আধুনিক রাষ্ট্রের জটিল কাঠামোতে শ্রমিক আন্দোলনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও বিকাশে রাজনৈতিক দলগুলোর অনুগ্রহ যথেষ্ট নয়। এর জন্য বিভিন্ন আইনি, গবেষণা, শিক্ষা ও মানবাধিকার সংগঠনের সহযোগিতা অপরিহার্য। এসব কাজকেও এগিয়ে নিতে চায় বাশি।

বাশি কীভাবে পরিচালিত হয়?

মূলত দুইটি পর্যায়ে বাশির নীতিনির্ধারণ ও কর্মসম্পাদন হয়: অছি পরিষদ বা ট্রাস্টি বোর্ড এবং নির্বাহী পরিষদ।

অছি পরিষদ বাশির শীর্ষ নীতি নির্ধারণী মহল। শ্রমিকদের স্বার্থে নিবেদিত, ত্যাগী, সাহসী, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত হয় অছি পরিষদ। অছিরা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক, তাই সম্পত্তি বা লভ্যাংশের মালিক হতে পারেন না, বরং উল্টো প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পত্তি দান করেন। বাশির মৌলিক নীতি নির্ধারণ, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ঠিক করা, নির্বাহী পরিষদে নিয়োগ দান ইত্যাদি অছি পরিষদের আওতাধীন বিষয়।

মৌলিক নীতির ওপরে ভিত্তি করে বিস্তারিত কর্মসূচি নির্ধারণ ও সম্পাদনের জন্য আছে বাশির নির্বাহী পরিষদ। এ পরিষদ তার কর্মকাণ্ড ও দায়িত্ব পালনের জন্য অছি পরিষদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। এর দপ্তর আটটি: শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনা, হিসাব, সংগঠন, আইনি সহায়তা, মহাফেজ, প্রচার এবং জনস্বাস্থ্য। প্রতিটি দপ্তর একজন পরিচালকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।

বাশি তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা করে। স্বেচ্ছায় ‘অবাধ তথ্য প্রকাশের নীতি’ মেনে চলা বাশির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। বাশির অছি পরিষদ, নির্বাহী পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের তৎপরতা, পরিকল্পনা, চলতি কার্যক্রম, প্রতিবেদন ও মূল্যায়ন, সব ইশতেহার ও নীতিমালা, বইপুস্তক, বাজেট এবং আয়-ব্যয়ের হিসাবসহ অন্যান্য তথ্য সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সেসব তথ্য চাইলে, নির্ধারিত সময়ের পর তা সরবরাহ করা হয়।

শ্রমিক শ্রেণির লড়াকু সংগঠনগুলোর কোন ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা তাদের কাছ থেকে জেনে, তা অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়। সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপরে নিজস্ব মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে না দিয়ে, গণতান্ত্রিক উপায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বাসী এ ইনস্টিটিউট।

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের অর্থের উৎস কী?

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের (বাশি) আয়ের প্রাথমিক উৎস হলো দরদি, অছি পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের দেওয়া চাঁদা। এছাড়া বিশেষ কর্মসূচি উপলক্ষে গণচাঁদাও সংগ্রহ করা হয়। সহযোগী সংগঠনগুলোও নিয়মিত চাঁদা দিয়ে থাকে।

শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি নিবেদিত শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, ফেডারেশন বা ব্যক্তিদের থেকেও নেওয়া হয় সহযোগিতা। যেসব আন্তর্জাতিক সংগঠন বাশির লক্ষ্য ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একমত এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, আদর্শ কর্মস্থল বাস্তবায়ন, ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে সহায়তা করে থাকে, তাদের থেকেও আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয়।

সরকার এবং আন্তর্জাতিক শ্রম তহবিলের কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা নিতে আপত্তি নেই বাশির। কারণ এ সংস্থা মনে করে শ্রমিক শ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রকে যেসব কর, মূসক বা শুল্ক দেয়, তা দিয়েই সরকারের তহবিল গঠিত হয়। আর সেখান থেকেই সরকার প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শ্রম তহবিলে চাঁদা দিয়ে থাকে। সরকারের কোষাগার থেকে অর্থ নেওয়া মানে শ্রমিকদের অর্থ ‘শ্রমিকদের কল্যাণে’ ব্যয়ের পরিসর বাড়ানো।

আর্থিক সহায়তা প্রদানকারীরা যাতে বাশিকে তার মৌলিক নীতি ও কর্মসূচি থেকে বিচ্যুত করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক নজর রাখে বাশি।

বাশির তৎপরতা কি সব শ্রমিকদের জন্য কল্যাণকর?

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) কাজ করে শ্রমজীবী মানুষদের কল্যাণে। শ্রমিকদের মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে সাহায্য করাই এর অভিপ্সা। শ্রমিক ও তাদের পরিবারের লোকেরাই সমাজের বা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ। যারা শর্তসাপেক্ষে মজুরি বা বেতনের বিনিময়ে কাজ করে, তারা শ্রমিক। এ ছাড়া বর্গাচাষি, বিক্রয় প্রতিনিধি, ঠিকাকর্মী, শিক্ষক, পুলিশ, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ যারা আইনত বেতনের বিনিময়ে ঘণ্টা ধরে কাজ করে, তারা সবাই শ্রমিক। রিকসাওয়ালা, ছোট ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যারা নিজের মালিকানাধীন কারবার চালানোর জন্য নিজে শ্রম দিতে বাধ্য, তারাও শ্রমিক। মসজিদ-মন্দির-গির্জা-আশ্রমের বেতনভোগী ইমাম-মুয়াজ্জিন-পুরোহিত সবাই শ্রমিক। তবে স্বাধীন শিল্পী, খেলোয়াড়, কোম্পানির ডিরেক্টর বা পরিচালক, লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী ও নিয়োজকেরা শ্রমিক নয়। মোটকথা, জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই শ্রমিক। শ্রমিকদের জন্য কাজ করার পরোক্ষ অর্থ হলো সমাজের জন্য কাজ করা। শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যদি ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা যায়, তবে তাতে পুরো সমাজের লাভ। শ্রমিকেরা বেশি মজুরি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা, অধিকার বা স্বীকৃতি পেলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা যেমন ঠিক থাকে, তেমনি দূর হয় দারিদ্র্য ও দুর্নীতি।

আরেকটি বিষয় হলো, শুধু অর্থনৈতিক অধিকার বা স্বার্থ উদ্ধারই শ্রমিক আন্দোলনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বরং সমাজে শ্রমিকেরা যাতে স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজেদের ‘মর্যাদা’ পায়, সেটি নিশ্চিত করাই শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান কাজ। পুঁজিবাদী সমাজ-কাঠামো শ্রমিকদের শোষণ করে, এটা বড় কথা নয়। পুঁজিবাদের অধীনে শ্রমিকেরা মানবিক জীবনযাপন সুযোগ হারাতে থাকে, তাদের মানসিক যন্ত্রণা বাড়তে থাকে এবং ক্রমে পুরো জীবনটাই হয়ে পড়ে জটিল। যা পুঁজিবাদ-পূর্ব যুগে বা প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে দেখা যেত না। সে সময় মানুষের সার্বিক জীবনযাপন তুলনামূলকভাবে সরল ছিল। এখনকার সমাজ-বাস্তবতাটির সঙ্গে ১০০ বছর আগের অবস্থার তুলনা করলেই তা সহজ হয়ে যায়। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকের জীবন অনেক কঠিন ও জটিল বলে এখানে শ্রমিকদের এমন সব কর্মকাণ্ড ও তৎপরতা চালাতে হয়, আগের সমাজে যেসবের কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

শ্রমিক-জীবনটাই এক জটিল প্রক্রিয়া। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষদের আয়ে পার্থক্য থাকলেও, সবাইকে কাজ করতে হয় অন্যের অধীনে। যেকোনো সময় চাকরি চলে যেতে পারে, এমন ভয় শ্রমিক-জীবনে সহজাত। মালিক বা নিয়োজক কাজের ধরন ও পরিসীমা নির্ধারণ করে দেয় বলে শ্রমিক কখনোই কাজের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে না—বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। তারা নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়, কিন্তু পারে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সম্পদের স্বল্পতা, শহর জীবনে প্রতিযোগিতা শ্রমিকদের ক্ষুদ্র বাড়িতে বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস, নানা শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা এবং মানসিক সংকীর্ণতার দিকে ঠেলে দেয়। খুব স্বল্প শ্রমিকই এসব সমস্যা এড়িয়ে টিকে থাকতে পারে।

শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়লে, নিজেরা শিক্ষিত হলে এবং অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে পারলে এসব সমস্যা অনেকখানি কাটানো যায়। কারখানা পরিচালনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে শ্রমিকেরা কিছুটা হলেও মানুষের মর্যাদা ফিরে পায়। ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার কাজ, প্রতি কর্মস্থলে ট্রেড ইউনিয়ন, আদর্শ কর্মপরিবেশ ও সব শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য একক গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের দাবি’ আদায় হলে শ্রমিক ও তাদের সন্তানেরা মানবিক ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের সুযোগ পায়। নানা কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে এ লক্ষ্যই পূরণ করতে চায় বাশি।

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের কাজে গণতান্ত্রিকতা কীভাবে নিশ্চিত হয়?

সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে, কাজ শেষ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আলাপ-আলোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। ব্যক্তিসর্বস্বতা নয়, গ্রহণ করা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে। কাজ শুরুর আগে, চলার সময়ে এবং কাজ শেষে রিপোর্ট দিয়ে থাকেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এ ছাড়া প্রতিটি নতুন সদস্যের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। স্বাগত জানানো হয় সংগঠনের ভেতরে সমালোচনা, বিতর্ক ও নতুন চিন্তাকে। কর্মীরা যাতে ঊর্ধ্বতনদের আজ্ঞাবহ হয়ে না থাকে, সে দিকে সতর্ক নজর রাখা হয়। কারণ না দেখিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার চর্চা এখানে বিবেচিত হয় গুরুতর অন্যায় হিসেবে।

বাশি কি সুনির্দিষ্ট কোনো মতবাদে বিশ্বাসী?

বাশি শ্রমিকপন্থী। অর্থাৎ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্যাণে কাজ করাই এর লক্ষ্য। এটি অবশ্যই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে, তবে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী নয়। এটি কোনো মতবাদ বা পার্টির অন্ধ অনুসরণ করে না। বাশি চায় দেশের খেটে খাওয়া মানুষেরা অর্থাৎ কৃষক-শ্রমিকেরা দরিদ্র হওয়ার কারণে যেন অধিকার বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে। যে অর্থব্যবস্থা শ্রমিকদের ‘বিপন্ন জনগোষ্ঠী’ করে তুলেছে, বাশি তার সামালোচনা করে। শ্রমিকদের মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা ও আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে শ্রমিকদের একত্রিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে বাশি। শ্রেণি সংগ্রামের পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়ে, সর্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলার সংগ্রামে এ ইনস্টিটিউট অবিচল।

বাশি কি এনজিও, নাকি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন?

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউটের জন্য যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হন, তা হলো এটি কি এনজিও [বেসরকারি প্রতিষ্ঠান] নাকি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন।

বাশি একটি পেশাদার দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এটি ট্রাস্ট আইনে নিবন্ধিত। কাজ করে শ্রম, শ্রমিক ও শিল্প নিয়ে। স্বার্থ দেখে শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন ও আন্দোলনের। বিভিন্ন প্রকল্প, তৎপরতা বা কাজ বাস্তবায়নের জন্য বাশি প্রায়ই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন বা ব্যক্তির কাছ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে থাকে। বাশি নিজে কোনো বাণিজ্য পরিচালনা করে না। তবে সংগঠনের তহবিল সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড [যেমন: বই-পুস্তক-পত্রিকা প্রকাশ, স্মারক বিক্রি ইত্যাদি] চালায়। ভবিষ্যতে শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল, লাইব্রেরি, সংগ্রহশালা, বিশ্ববিদ্যালয় চালুর পরিকল্পনা আছে বাশির। এসব তৎপরতা ও পরিকল্পনার কারণে প্রায়ই মনে হয়, বাশি হয়তো এনজিও বা রাজনৈতিক দল। অথচ বাশি এসবের কোনোটাই নয়।

আভিধানিক অর্থে বেসরকারি সংস্থা [বেস বা এনজিও] হলো এমন সব প্রতিষ্ঠান যারা সরকারের অধীনস্থ নয় আবার প্রথাগত মুনাফা উৎপাদনকারী বাণিজ্যিক কারবারও নয়। সাধারণত কয়েকজন ব্যক্তির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় একেকটি এনজিও। সরকার, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা সাধারণ একজন ব্যক্তিও হতে পারে এসব এনজিওর অর্থ বা সহায়তা দাতা। কিছু কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলে সবধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বর্জন করে এবং অর্থের জন্য পুরোপুরি নির্ভর করে দরদি বা স্বেচ্ছাসেবীদের ওপরে। কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এনজিও বা কী ধরনের কাঠামো থাকলে সেগুলোকে এনজিও বলা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কারণ এনজিও বলতে যাদের বোঝানো হয়, তাদের গঠনের মধ্যে যেমন ভিন্নতা আছে, তেমনি লক্ষ্য বা তৎপরতাও বহুবিচিত্র। এনজিওগুলোর কোনোটা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, কোনোটা নিবন্ধিত, কোনোটা আবার সামাজিক কাজের জন্য কর-ছাড় প্রাপ্ত। কোনোটার প্রতিষ্ঠা সমাজকল্যাণে, কোনোটা রাজনৈতিক কারণে, কোনোটা আবার ধর্মীয় বা জাতিগত স্বার্থ রক্ষার্থে।

কিন্তু বাংলাদেশে এনজিও বলতে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যেগুলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ [আঅত], এডিবি [এউব], ডিএফআইডি [আউদ], ইউএনডিপি [জাউপ্র] বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নিয়ে নয়াউদারবাদী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে বা ক্ষুদ্রঋণের কারবার করে অথবা বিভিন্ন গবেষণা ও সমাজসেবা কার্যক্রম চালায়। এ অর্থে বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) এনজিও নয়। কারণ বাশি ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থও নিচ্ছে না। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালানোর নামে ‘সুদি ব্যবসা’ চালানোর কোনো কর্মসূচিও নেই তার।

আবার রাজনৈতিক সংগঠনের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া, বা বিপ্লব করা কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের মতো কোনো কর্মসূচি বাশির নেই। বাশি মনে করে, নিজের মতো সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ার অধিকার সব নাগরিকেরই আছে। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য লড়াই বা বিপ্লবের দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর। বাশির সংগঠক, দরদি ও স্বেচ্ছাসেবীদের অনেকেই রাজনীতি সচেতন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের অনুসারীও বটে। কিন্তু সংগঠন হিসেবে বাশি কোনো রাজনৈতিক দল-মতের অনুসারী নয়।

বাশি কি সংগ্রামের নির্দিষ্ট মডেল আরোপ করতে চায়?

শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে বাশি কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আরোপ করতে চায় না। বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম, আলোচনা ও বিতর্কের ঘটনাকে বাশি শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বলে বিবেচনা করে। এ দেশের মানুষ ও প্রকৃতি যেভাবে ক্রিয়া করে, তা থেকেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি তৈরি হতে পারে।

কোনো যুক্তিযুক্ত ও সঠিক পদ্ধতির ব্যাপারে বাশির অস্পৃশ্যতার ধারণা নেই। যেমন : শিক্ষা ও আচরণের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পাওলো ফ্রেইরি, জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি বা আলেকজান্ডার সুদারল্যান্ড নীলের মতবাদকে অধ্যয়ন করা এবং নিজেদের প্রশিক্ষণশালায় সেগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোতে বাশির কোনো আপত্তি নেই। কর্মসাধনই বাশির উদ্দেশ্য, অন্ধ অনুকরণ নয়।

বাশিতে তরুণেরা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

শ্রমিকদের জন্য বই-পুস্তক সংগ্রহ ও তৈরি, শ্রমিকদের স্কুলে পাঠদান, চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা দেওয়া, ইতিহাস রচনা, পত্রিকায় রিপোর্ট ও প্রবন্ধ লেখা, গবেষণা ও জরিপ চালানো এবং মহাফেজখানা তৈরির জন্য উপাদান সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাশির কর্মকৌশল নির্ধারণ পর্যন্ত বহু কাজ করে তরুণ ও যুবকেরা। স্কুল ও কলেজ পড়ুয়ারা শ্রম অধিকার এবং শ্রমিকদের রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ে সচেতন হয়ে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে পারে। শ্রমিকদের নিয়ে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নাটক লিখে; চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র বানিয়ে বা শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের সংগ্রামে যোগ দিয়েও অনেক কিছু করা যায়। পড়ুয়াদের সুবিধা দুটি। প্রথমত, সংসারের ঝামেলা কম এবং চাকরি বা ব্যবসা করতে হয় না বলে হাতে কিছুটা সময় থাকে। এ দুটো সুবিধাকে কাজে লাগালে নিজের বিকাশ যেমন সম্ভব, তেমনি শ্রমজীবী মানুষদের কল্যাণে কাজ করাও কঠিন নয়।

একজন প্রযুক্তিবিদ বা শিল্পী কীভাবে বাশিতে কাজ করতে পারেন?

বাশির কাজ বহুবিধ। শ্রমিকদের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার যেমন সীমা নেই, তেমনি তাদের জন্য করণীয়ও বহুমাত্রিক। অনেকভাবে বাশিকে সহায়তা করা যায়। যেমন : সফটওয়্যার তৈরি করে, শ্রমিকদের কম্পিউটার ও যন্ত্রপাতি চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়ে, গান-কবিতা-উপন্যাস লিখে, শ্রমিকদের স্কুলে পড়িয়ে, ইতিহাস রচনা করে, এমনকি ঘরে বসে অনুবাদ বা সংবাদপত্র কাটাসহ বিভিন্নভাবে বাশিকে সহায়তা করা সম্ভব।

ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলো থাকবার পরও শ্রম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?

ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলো সরাসরি শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের জটিল ব্যবস্থা, উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার বৈশ্বীকরণ এবং শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের কূটকৌশলের মধ্যে টিকে থাকতে গেলে শ্রমিক আন্দোলনের আরও কিছু সহযোগিতা প্রয়োজন।

দেশে তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্পায়ন, কৃষি, রাজনীতি, রাজাকারদের বিচার, মার্কসবাদ, ইসলামী রাজনীতি থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, যৌনতা, বাজারসদাই পর্যন্ত অনেক কিছু নিয়ে দেশের বইপত্রে বা গণমাধ্যমে হরদম আলোচনা-লেখালেখি হয়। কিন্তু শ্রম খাত নিয়ে আলোচনা সে অনুপাতে খুবই কম। আরেকটি সমস্যা হলো অনুন্নত দেশে শিল্পের বিকাশ। বড় শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠায়, দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন খুব বেশি হয়নি। শ্রম খাত নিয়ে গবেষণার দরকার হয়েছে আরও কম। অনেকেই জানতে পারে না যে, শ্রম খাত এক বিরাট জগত এবং তারা নিজে এ জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আরেকটি বিষয় হলো রাজনৈতিক বিরূপতা। সরকার বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক-স্বার্থবিরোধী আইন-বিধি প্রণয়ন করে ক্ষান্ত হয়েছে, তা নয়। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন দলগুলো বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে উৎকোচ দিয়ে, অত্যাচার-নিপীড়ন করে ধ্বংস করেছে। সৎ-নিষ্ঠাবান শ্রমিক নেতাদের হত্যা-জেল-জুলুম করে, সুবিধাবাদী, দালাল ও দুর্নীতিবাজ শ্রমিক নেতাদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। পরে ঢালাও সরকারীকরণ করে, কারখানাগুলোর ইউনিয়ন সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেগুলোর বেশিরভাগে সৎ নেতাদের বদলে অসৎ ও গুণ্ডাপ্রকৃতির লোকেদের বসিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে শাসকদলগুলো। কিছু সৎ শ্রমিক নেতা ও সংগঠন শ্রমিকদের স্বার্থে অবিচল থাকলেও তাদের সংখ্যা ও প্রভাব অতি নগণ্য।

নয়াউদারবাদী ব্যবস্থা শ্রমিকদের রঙিন স্বপ্নে ভোলানোর আয়োজন করেছে। টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও বেতারে বিজ্ঞাপন, নাটক, সংবাদ প্রতিবেদন, চলচ্চিত্র বা গানের মাধ্যমে শ্রমিকদের মগজধোলাইয়ের কার্যক্রম চলছে। প্রেম, ভালোবাসা, যৌনতা, রেষারেষি, হিংসা, মারামারি, কাটাকাটি, ভুতের ভয় ইত্যাদি অভিনব টনিক হয়ে কাজ করছে মগজশূন্য করার প্রক্রিয়ায়। তরুণদের ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে যৌনতা, স্মার্টফোন, ফুটবল-ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বা মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপন-প্রতিবেদন দিয়ে।

টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের বাহারি রঙের আড়ালে থেকে যাচ্ছে শহরের নোংরা-ময়লা বস্তি ও বস্তিবাসী। মদের বারের ফিকে আলোতে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ‘অমানুষ’ হয়ে যাওয়ার বেদনা। নয়াউদারবাদী ব্যবস্থা যে যুদ্ধের জন্য অর্থ জোগাড় করতে পারে, চিকিৎসার জন্য পারে না, সে বাস্তবতাটি ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিজ্ঞাপন, নাটক ও চলচ্চিত্রের মোহনীয় দাওয়ায়। করপোরেট অফিসে কেরানি, দপ্তরি, টাইপিস্ট ইত্যাদি পদের নতুন নামকরণ হয়েছে ইকজিকিউটিভ, রিলেশনশিপ অফিসার ইত্যকার সব ইংরেজি নাম। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পেশাদার গবেষক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানীদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরাও শ্রমিক। এমন এক জ্ঞানশূন্য অবস্থা তৈরি হয়েছে যে মনে হচ্ছে শ্রমিক বলতে কেবল গার্মেন্ট শ্রমিক, ঝাড়ুদার, বাসের চালক বা ইমারত নির্মাণ শ্রমিকদেরই বোঝায়। আত্মপরিচয়ের সংকটের কারণে বহু তরুণ শ্রমিক বা শ্রমিকদের পোষ্যরা শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হতে পারছে না।

এসব নতুন নতুন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করার জন্য গবেষণা, অধ্যয়ন ও চর্চার কোনো বিকল্প নেই। একটি শ্রম ইনস্টিটিউট কেবল শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করতে সহায়তা করে তা নয়, শ্রমিকদের হয়ে নীতিনির্ধারকদের কাছে তদ্বিরও করে। বলা চলে, সময়ের প্রয়োজনেই শ্রম ইনস্টিটিউটের উদ্ভব ও বিকাশ।

বাশির সহযোগী সংগঠন হওয়ার সুবিধা কী?

বাশির সহযোগী বা এফিলিয়েটেড সংগঠনগুলোকে বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা, পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক দেওয়া হয়। যেসব ইউনিয়ন বা সংগঠন নিজেরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার আয়োজন করতে পারে না, বাশির প্রশিক্ষণে তারাও উপকৃত হয়। সহযোগী সংগঠনগুলো বাশির নির্বাহী পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করে বলে, তারাও বাশিকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসূচি নির্ধারণ করতে পারে।

বাশির সহযোগী হতে হলে ট্রেড ইউনিয়ন, ফেডারেশন বা শ্রমিক সংগঠনগুলোকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন, কমিটি গঠন, অর্থের হিসাব প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে হয়। শর্তপূরণ করতে গিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভেতরেও গতি আসে।

সহযোগী সংগঠনগুলো প্রয়োজনে বাশির কাছ থেকে বিনা সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ নিতে পারে। অর্থের অভাবে কাজ আটকে থাকে না। বাশি চায় সহযোগী সংগঠনগুলো শ্রমিকদের জন্য নিজস্ব লক্ষ্য ও কৌশল অনুযায়ী কাজ অব্যাহত রাখুক।

শ্রমিক শ্রেণির লড়াকু সংগঠনগুলোর কোন ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা তাদের কাছ থেকে জেনে সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা সাজায় বাশি। সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপরে নিজস্ব মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গী চাপিয়ে দেওয়ার চর্চায় বিশ্বাসী নয় এ ইনস্টিটিউট। সব বিষয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা বাশির একটি বিশেষ কার্যক্রম।

বাশির সহযোগী হওয়ার নিয়ম কী?

বাশির সহযোগী হওয়ার নিয়ম তার গঠনতন্ত্রে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আগ্রহীর ঘোষণা ও কার্যক্রমে এটা পরিষ্কার হতে হবে যে, সেটি শ্রমিকদের স্বার্থের পক্ষের। দ্বিতীয় শর্ত হলো : সংগঠনটির পরিচালনা পরিষদ হতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের। সেটির লিখিত গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র এবং সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি থাকা বাঞ্ছনীয়। তৃতীয়ত, প্রতিবছর সংগঠনের আয়-ব্যয়ের হিসাব বাশির কাছে পেশ করতে হবে।

নিয়োজক-শ্রমিক সর্ম্পককে বাশি কীভাবে দেখে?

বাশি মনে করে, মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক শত্রুতার বা সংঘাতে নয়, বরং একটি দ্বান্দ্বিক বিষয়। আইনি কাঠামোর মধ্যে এবং নিয়মতান্ত্রিক দরকষাকষির মাধ্যমেই শ্রমিকেরা বহু দাবিদাওয়া আদায় করতে পারে। এর জন্য রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুরের প্রয়োজন নেই। তবে শ্রমিকেরা যাতে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাদের দাবিদাওয়া পেশ করতে এবং তা নিয়ে দরকষাকষি করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা নিয়োজকদের দায়িত্ব। পুঁজিবাদী সমাজে নিয়োজকেরাই যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং শ্রমিকেরা যে পুরোপুরি শোষিত-নিপীড়িত-অবহেলিত এবং নিতান্তই ক্ষমতাহীন, সেটি বাশি ঠিক খেয়াল রাখে। তবে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্যে যে বিপুল শক্তি ও ক্ষমতা নিহিত আছে, সেটিও বাশির বিবেচ্য।

বাশির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কী?

বাশি কোনো রাজনৈতিক দলের অংশ নয় এবং কোনো দলের পৃষ্ঠপোষকও নয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে বাশি। কারণ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সংগঠনের শ্রমিক গণসংগঠন আছে এবং সবাই শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে থাকে। এসব গণসংগঠন কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ফেডারেশন হিসেবে কাজ করে, কখনো নয়। কিন্তু তারাই বিভিন্ন সময় শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম করে বলে বাশি তাদের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। এসব সংগঠনের সদিচ্ছাকে বাশি সম্মান ও সমীহ করে। গণসংগঠনগুলোর মধ্যে যেন এক শক্তিশালী ঐক্য ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেজন্য কাজ করে বাশি।

বাশির আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হয়?

বাশির আয়-ব্যয়ের মাসিক ও বার্ষিক রিপোর্ট তৈরি হয়। বছর শেষে নিরীক্ষা করানো হয়। প্রতিটি অনুষ্ঠান বা প্রকল্পের পর অছি পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের কাছে অর্থের হিসাব দাখিল করা হয়। কোনো দরদি, সংগঠন বা ইউনিয়ন বাশিকে অর্থ সহায়তা দিলে, বাশি সেটির উৎস অনুসন্ধান করে। অন্যায়ভাবে লব্ধ অর্থ ‘সাহায্য’ হিসেবে নিতে বাশি আপারগ।

শ্রমিক আন্দোলন বিকাশের প্রশ্নে বাশি বিভিন্ন পরিবেশবাদী, নারীবাদী, সংখ্যালঘু বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখে?

কেবল মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রম ঘণ্টার দাবি আদায় হলেই শ্রমিকদের চলবে, এমনটা নয়। শ্রম দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে এবং স্বাধীন মানুষ হতে শ্রমিকদের আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা উতরাতে হবে। বহু দার্শনিক ও নীতিগত অবস্থানও পরিষ্কার করার প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশবাদী, নারীবাদী, সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বড় ধরনের ভূমিকা পালনের অবকাশ রয়েছে। এসব সংগঠনের তৎপরতার সুবিধা ভোগ করে শ্রমজীবী মানুষেরা। মোটকথা, শ্রমিকদের সার্বিক মুক্তির জন্য শুধু দরকষাকষি, মিছিল বা সমাবেশ করা যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগী তৎপরতাও জরুরি।

বাশি কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

মুক্তবুদ্ধির চর্চার জন্য ‘রাষ্ট্রের খাতে, সমাজের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়’ থাকা জরুরি। শ্রমিকদের জন্য ‘নিজেদের খাতে নিজেদের হাতে’ বিশ্ববিদ্যালয় থাকাও একইভাবে জরুরি। গবেষণা কাজ হলো এমন প্রকল্প যা নির্ধারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রকদের কর্তৃত্বে। গবেষণার ওপরে শ্রমিকদের প্রভাব না থাকলে, তা শ্রমিক-স্বার্থ রক্ষার বদলে মালিকদের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া সময়ের সাথে সাথে শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর অধ্যয়ন ও গবেষণা বাড়ানো দরকার। শ্রমিকদের অস্তিত্বের স্বার্থেই তাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ‘সরকারি’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরে চাপ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা শ্রমিকদের স্বার্থে তৎপরতা চালায়।

তা ছাড়া, বহু মেধাবী শ্রমিক অর্থাভাব, পাঠ্যক্রমজনিত সমস্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কাঠামোর কারণে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। তাদের জন্য সুবিধাজনক পাঠ্যক্রম ও পরিকল্পনার ব্যবস্থা থাকা উচিত। যা নিশ্চিত করতে পারে একটি স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়। আবার, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়, এতে বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক তৎপরতার মধ্যদিয়ে ব্যক্তির বিকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত ও জ্ঞান উৎপাদনী প্রতিষ্ঠান বলে এটি পরিচালনায় শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক।

বাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রাথমিক স্কুল বা শ্রমিকদের জন্য নৈশ স্কুল স্থাপন করতে তেমন আগ্রহী নয় কেন?

বাশি যে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রাথমিক বা শ্রমিকদের জন্য নৈশ স্কুল স্থাপনের বিরোধী, তা নয়। বরং প্রয়োজনে বাশি এ ধরনের বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহী। আর শিশুদের জন্য অবৈতনিক স্কুল বা বয়স্কদের জন্য নৈশ স্কুল চালালে বাশির বেশ সুবিধাই হয়। উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত ও দরিদ্র এই রাষ্ট্রে গরিব ও গ্রামের লোকেদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা স্বদেশি আন্দোলনের যুগ থেকেই মহৎ ও প্রশংসনীয় বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। অমন স্কুল স্থাপন করলে বাশির সুনাম ভিন্ন দুর্নাম হবে না। দরদিদের কাছ থেকেও বহু অর্থ পাওয়া সম্ভব। আর সমাজে ‘স্কুল প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবেও বাহবা কুঁড়ানো যাবে। কিন্তু বাশি মনে করে, কেবল সেসব স্থানেই স্কুল প্রতিষ্ঠা করা উচিত যার আশপাশে সরকারি স্কুল নেই বা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। দেশে বরং কারিগরি স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

শ্রমিকেরা প্রতিদিন সরকারকে কোটি কোটি টাকার কর-মূসক-শুল্ক দিয়ে চলেছে। এ কারণে শ্রমিক-সন্তানদের শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপরে। প্রতিটি সরকারি বা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেন শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য ভালো শিক্ষার বন্দোবস্ত হয়, সেজন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়া কর্তব্য। বাশি মনে করে, শিক্ষা শ্রমিকদের অধিকার, সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের।

আর শ্রমিক সমাজের বিকাশের জন্য অপরিহার্য জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চার অভাব পূরণে প্রয়োজন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ কোনো সরকারই এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে দিচ্ছে না।তাই বাশি এ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে আগ্রহী।

বাশি হাসপাতাল তৈরি করতে চায় কেন?

প্রতিটি কর্মস্থলে শ্রমিকদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং বড় কর্মস্থলে হাসপাতাল স্থাপনের দাবিটিকে বাশি যৌক্তিক বলেই মনে করে। এ জন্য নিয়োজকদের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দরকষাকষি অব্যাহত রাখাকেও সমর্থন করে বাশি। শ্রমিকদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, সেসবে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া এবং সেগুলোর জন্য যথাযথ পরিকল্পনা করাকেও জরুরি বলে মনে করে বাশি। সরকার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেবে বলেই তারা কর-মূসক-শুল্ক দেয়। কিন্তু সরকার যদি তা না করে বা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা অবশ্যই নিন্দনীয় ও অন্যায়।

সরকারি হাসপাতালের এমন সক্ষমতা ও প্রস্তুতি থাকা উচিত যাতে শ্রমিকদের সব রোগের চিকিৎসা সেখানেই দেওয়া যায়। প্রয়োজনে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের দায়িত্বও সরকারের। তবে অনেক সময় বিভিন্ন অপরিকল্পনা বা সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল বা সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয় সরকার। তা ছাড়া বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও বেশি অর্থ ব্যয়ের মতো বেশকিছু সমস্যা আছে। তাই শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক এলাকাতে চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বেশকিছু বড় হাসপাতাল স্থাপন জরুরি। অবসর ও বেকার জীবনে শ্রমিকেরা যাতে সুচিকিৎসা পায়, সেজন্যও এ আয়োজন থাকা প্রয়োজন।

পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকদের জন্য নয়, তাদের মালিকদের জন্যই সব আয়োজন। নয়াউদারবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ ক্রমে কমানো হচ্ছে এবং মানুষের এই মৌলিক প্রয়োজনের খাতটিকে করা হয়েছে অর্থনির্ভর। যার টাকা আছে, সে চিকিৎসা পাচ্ছে; যার নেই, তারা রোগে ভুগে মরছে। এই অমানবিক ব্যবস্থা দিনের পর দিন চলতে পারে না। তাই সরকারকে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি, শ্রমিকদের নিজেদের সক্ষমতাও বাড়ানো দরকার।

বাশি কেন সংগ্রহশালা তৈরি করতে চায়?

বলা হয়ে থাকে ‘ইতিহাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ যার, শাসনক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ তার’। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ইতিহাস চর্চার বিকল্প নেই। তা ছাড়া নতুন শ্রমিকদের জন্য পুরনো শ্রমিকদের সংগ্রাম ও লড়াইয়ের ইতিহাস জানাও খুব দরকার। সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিশা তো মিলবে অতীতের ভুল ও অর্জন থেকেই। তাছাড়া এই দেশের স্বাধীনতা এবং এখানকার জাতিগুলোর মুক্তির জন্য কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের যে বিশাল অবদান, তার স্বীকৃতি তো প্রয়োজন। শ্রমিক আন্দোলনের যে বিরাট ইতিহাস ও গৌরব তা সংরক্ষণ করাও আবশ্যক। উপনিবেশিক শাসন থেকে বাংলার মুক্তি এবং এ দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে লড়েছিল শ্রমিক ও কৃষকেরা। কিন্তু প্রচলিত ইতিহাসে তাদের অবদান যেন স্বীকৃত নয়। মনগড়া গালগল্পকে ইতিহাস বলে চালিয়ে দিয়ে বুর্জোয়ারা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যেন দেশের মুক্তি ও বিকাশে তাদের অবদানই মুখ্য এবং শ্রমিকেরা কেবল তাদের অনুগামী মাত্র। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটির প্রথম শহীদ কোনো না কোনো কৃষক-শ্রমিক।

শ্রমিক-কৃষকেরা প্রকৃত ইতিহাস না জানলে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তারা কমজোর হয়ে পড়বে। আত্মমর্যাদাবোধ ও সাহস নিয়ে লড়তে পারবে না। যে দেশকে তারা উপনিবেশ থেকে মুক্ত করেছে, যে দেশে গণতন্ত্র ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, সে দেশের কাছ থেকে কেন তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও অধিকার বুঝে নিতে চাইবে, সে প্রশ্নের জবাব মিলবে তখনই যখন তারা সত্য ইতিহাসটি জানবে। এই দেশের উন্নয়নে শ্রম, অর্থ, মেধা ও ত্যাগের মাধ্যমে শ্রমিকেরা যে অবদান রেখেছে, তার তুলনা নেই। এ অবদান বিবেচনা করলে বোঝা সম্ভব যে কেন শ্রমিক-কৃষকেরা বুড়ো বয়সে বিনা মূল্যে খাবার, চিকিৎসা বা বাসস্থান পাবে এবং কেন এ দেশে তাদের মর্যাদাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ।

বিদ্যমান কৃষক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিষয়ে বাশির অবস্থান কী?

এসব সংগঠন কৃষক-শ্রমিকদের জন্য অব্যাহতভাবে কাজ করে চলেছে। তবে বেশির ভাগ সংগঠনে বুলিবাগিশতার চর্চা থাকলেও কাজ-সর্বস্বতার চর্চা কম। কিছু কিছু সংগঠনের এমন তৎপরতাও আছে, যা শ্রমিক-কৃষকের জন্য মঙ্গলজনক নয়। সংগঠনগুলোর মধ্যে অনৈক্য এবং শ্রমিক-স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে পুরো শ্রমিক-কৃষক সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার ফল প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে। এসব প্রবণতা ছেড়ে নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করা জরুরি। অতীতের অর্জন-ভ্রান্তি এবং বর্তমান সময়ের প্রতিবন্ধকতাগুলো বিবেচনা করে, সঠিক কর্মনীতি ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, অর্জনগুলোকে উদযাপন এবং হতাশাকে ঝেড়ে না ফেললে সামনে এগোনো কঠিন। বেশির ভাগ সংগঠনের বহু সাফল্য আছে এবং সেগুলোই হতে পারে দিশারী।

বাশি যা যা করতে চায়, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অধীনস্ত শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলো কী তা করতে অক্ষম?

প্রথমত, ওইসব শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের কাজ বাশির কাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং উভয়ের কাজের ধরন ভিন্ন। দ্বিতীয়ত, বাশি একটি শ্রম শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নয়। তৃতীয়ত, যেসব সংগঠন সত্যিই শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় এবং অধিকার আদায়ে কাজ করছে, বাশির লক্ষ্য হলো সেসব সংগঠনকে সহায়তা করা; তাদের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা নয়।

শিশুদের জন্য বাশির কর্মসূচি নেওয়ার কারণ কী?

না থাকলে ভালো হতো, এমন বহু জিনিস পৃথিবীতে আছে। শিশুশ্রম এগুলোর অন্যতম। যাদের বয়স খেলে বেড়ানো আর লেখাপড়া শিখবার, তারা দেশের উন্নয়নে, সভ্যতার বিকাশে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে, এটা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে লাখ লাখ শিশু যে দিনরাত খাটছে সেটাই কেবল শঙ্কার বিষয় নয়। বহু শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশুরাই ভবিষ্যৎ। তারা যদি শিক্ষা-পুষ্টি-মুক্তি বঞ্চিত হয়ে, দারিদ্র্যের পীড়নে খেটে চলে, তাতে পুরো সমাজেরই ক্ষতি। এতগুলো কোমল-উচ্ছ্বল শিশুকে শ্রম দাসত্বের শেকলে বন্দী করে রাখার চর্চাটা কেবল নোংরা নয়, ভয়ংকর। কেবল ইতর শ্রেণির মানুষই এই অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ জারি রাখার পক্ষে দাঁড়াতে পারে।

শিশুশ্রম টিকে থাকার পেছনে প্রধান কারণ দারিদ্র্য, গৌণটি হলো নিয়োজকদের নিঃসীম লোভ। দারিদ্র্য হটানোর জন্য চাই অর্থ-সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং নিয়োজকদের থামানোর জন্য চাই কঠোর আইনি শাসন। এ দুই দাবিতে বাশি অবিচল, অনড়।

নারীদের জন্য বাশির বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার কারণ কী?

দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি অর্জনে নারী শ্রমের অবদান পুরুষ শ্রমের চেয়ে বিন্দুমাত্র কম নয়, বরং অনেকক্ষেত্রেই বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সামাজে নারীর গৃহশ্রম এবং সন্তান জন্মদান ও পালন যথাযথভাবে স্বীকৃত হয় না বলেই, অনেক সময় মনে হয় পুরুষরাই বুঝি কেবল দিনরাত খেটে চলেছে। কিন্তু সত্যটা ভিন্ন। এ ছাড়া সমাজে বহুদিন ধরে নারীদের সম্পদহীন করার চর্চা বিদ্যমান। প্রতিদিন মেয়েদের সম্পর্কে বহু ভুল ধারণা তৈরি ও ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীদের মগজধোলাইয়ের উদ্যোগও বিরল নয়। সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনার অভাবও নারীদের হামলার বস্তুতে পরিণত করেছে। চারদিকে প্রতিনিয়ত নারীদের নিপীড়িত-নির্যাতিত হওয়ার খবরই এসবের প্রমাণ।

নারীরা কেবল ঘরেই নয়, কর্মস্থলেও একইভাবে শোষণ-নির্যাতন-অসম্মানের শিকার হয়। পুরুষদের চেয়ে কম মজুরি পাওয়া, অথচ বেশি কাজ করা; পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হওয়া বা কর্মক্ষেত্রে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হওয়া এ দেশের নারীদের জন্য নিত্য ব্যাপার। সাধারণত পুরুষ শ্রমিকেরা সমাজে যত অত্যাচার-অবিচারের শিকার হয়, নারীদের ক্ষেত্রে তার পরিমাণ ও ধরন অনেক ব্যাপক। নারী শ্রমিকদের জন্য বাশির বিশেষ কর্মসূচি নেওয়াটা এ কারণে অবান্তর নয়।

সংগঠনে ব্যক্তির ভূমিকা প্রশ্নে বাশির অবস্থান কী?

বাংলাদেশের বেশির ভাগ সংগঠনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমষ্টি নয়, বরং ব্যক্তিকে মুখ্য বলে বিবেচনা করা হয়। মূলত একটি শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বা বুর্জোয়া সমাজে প্রতিষ্ঠানের গোড়াতে গুটিকয় ব্যক্তিকে বা একজন ব্যক্তিকে যে বিরাট ভার ও দায়দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়, তাতেই ব্যক্তির বা ছোট একটি গোষ্ঠীর একচ্ছত্র প্রভাবের বিষয়টি ভিত্তি পেয়ে যায়। আরও বেশ কিছু কারণে এমন বিবেচনা কাজ করে। যেমন : সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা, ‘ইতিহাস মহানায়কদের সৃষ্টি’ এমন বিশ্বাস, সামন্তীয় চিন্তার প্রভাব, পরিবারের গঠন, সম্পত্তির অসম বণ্টন, সংগঠনে গণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতির অনুপস্থিতি ইত্যাদি। এ ছাড়া মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকে বেশির ভাগ কাজের দায়িত্ব নিতে হলে, সংগঠন ধীরে ধীরে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। আবার সংগঠনের কাজে গণতান্ত্রিকতা না থাকলে যেমন আমলাতান্ত্রিকতা সে শূন্যস্থান পূরণ করে, তেমনি যৌথ প্রচেষ্টার সব পথ বন্ধ করে দেয় ব্যক্তিনির্ভরতা। এতে সংগঠনের বিকাশ হয়ে পড়ে রুদ্ধ, সদস্যরা হারায় মর্যাদা। বাশি মনে করে, সংগঠনের মুক্ত বিকাশের জন্য প্রতিটি ব্যক্তির গুরুত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যক্তিতন্ত্রের অবসানও জরুরি।

কর্মসাধনের কৃতিত্ব ‘ইতিহাসের মহানায়কদের’ — এ তত্ত্বে বাশি বিশ্বাসী নয়। আবার ব্যক্তিকে কেবল ‘ইতিহাসের ঘটনাবলীর অনুগামীমাত্র’ বলে বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গিও এড়িয়ে চলে এ ইনস্টিটিউট। ‘সংগঠিত মানুষই ইতিহাসের নির্মাতা’ এই বোধ এ ক্ষেত্রে সমাধান হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তি যত প্রতিভাবান বা দূরদর্শীই হোক না কেন, সমাজ বিকাশের মূল গতিপথকে পাল্টে দিতে সে পারে না। তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ‘প্রভাবক’ হিসেবে ব্যক্তি এমন ভূমিকা পালন করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে নির্ধারক ভূমিকা হয়ে দেখা দিতে পারে। কার্যত ব্যক্তির ভূমিকা হলো উদ্যোগ গ্রহণকারীর; আর ঐক্যবদ্ধ-জীবন্ত-সৃষ্টিশীল মানুষেরা হলো ইতিহাসের গতি নির্ধারক।

নারী-পুরুষ সম্পর্কের ব্যাপারে বাশির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

নারী, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ককে বাশি দেখে দুটি ভিত্তি থেকে : ১. বৈষম্যহীনতা ২. বহুমাত্রিকতা।

১. বৈষম্যহীনতা : বিভিন্ন লিঙ্গের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কে বৈষম্য এবং উঁচু-নীচুর কোনো জায়গা নেই বলে বাশি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ শুধু পুরুষ, শুধু নারী বা শুধু তৃতীয় লিঙ্গ হওয়ার কারণে এক ব্যক্তি অন্যের চেয়ে বেশি মর্যাদা ও ক্ষমতা পাওয়ার অধিকার রাখে না। অন্তত দুই হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বেশির ভাগ সমাজ পুরুষতন্ত্র দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে, যে সমাজে উচ্চক্রমিকতার ধারায় প্রথমে পুরুষ, তারপর নারী আর সবশেষে, অনেক তলানিতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অবস্থান। পুরুষতন্ত্র কর্তৃক লিঙ্গের ভিত্তিতে এই বিভাজন পৃথিবীর প্রতিটি সমাজের জন্য চরম শোষণের জন্ম দিয়েছে, ফলে অপূরণীয় ক্ষতির এমনকি ধ্বংসাত্মক বলে প্রমাণিত হয়েছে বারবার। এ উচ্চক্রমিকতার মধ্যে জন্ম হয়েছে নারীর ওপর চরম নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিত আর হিজড়ার জন্য চরম অবমাননাকর জীবনের। বাশি বিশ্বাস করে সর্বার্থে পুরুষতন্ত্রের অবসান হওয়া উচিত এবং লিঙ্গ পরিচয় মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্যের কারণ হতে পারে না।

২. বহুমাত্রিকতা : ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক, তা নারীর সঙ্গে নারীর, পুরুষের সঙ্গে পুরুষের এবং এক লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে আরেক লিঙ্গের মানুষের, যা-ই হোক না কেন, অনিবার্যভাবেই তাতে থাকে বহু মাত্রা। কোনো সম্পর্কই নিছক বন্ধুত্বের না, কোনো সম্পর্কই শুধু দাম্পত্যের না, বা কোনো সম্পর্কই শুধুই রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক না। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচারে এই বহুমাত্রিকতার পরিপ্রেক্ষিতটিকে মনে রেখে বিচার করাটা জরুরি।

তারপরও আমরা বলতে পারি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রাথমিকভাবে মূলত দুই ধরনের : ব্যক্তিগত ও সামাজিক। ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতটি আমরা সাধারণত ব্যবহার করি দুজন মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, যা বন্ধুত্বের হতে পারে, দাম্পত্যের হতে পারে, হতে পারে কোনো বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার, বা অন্য কোনো মাত্রায় বা ভিত্তিতে। অন্যদিকে মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সামাজিক দিকটিই প্রাধান্য পায়। আরো পরিষ্কার করে বললে, মানুষের মৌলিক সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্র হলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে সামষ্টিক বা যৌথ কর্মকাণ্ড।

তবে বিভিন্ন লিঙ্গের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, সেটা ব্যক্তিগত হোক কি সামাজিক, আবশ্যিকভাবেই তা হওয়া উচিত বৈষম্যহীন ও সাম্যের আদর্শে। এর কারণটাও খুব সরল, একজন মানুষের প্রজনন অঙ্গ কেমন, বা তা আদৌ আছে কি নেই, সেটির ওপর ভিত্তি করে সমাজের আর দশটা মানুষ যে অধিকার ভোগ করে, তা থেকে ওই বক্তিটিকে বঞ্চিত করা চলে না। জাতিসংঘও মৌলিক মানবাধিকার সংক্রান্ত দলিলে লিঙ্গের ভিত্তিতে সৃষ্ট যেকোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

ধর্ম প্রশ্নে বাশির অবস্থান কী?

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সমাজ বিকাশের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ধর্ম এসেছে এবং মানবসভ্যতার বিকাশে ধর্মের অবদান অপরিসীম। ব্যক্তির নীতি-নৈতিকতা ও অভিরুচি বিনির্মাণে ধর্মের ভূমিকাকে বাশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

তবে বহু ধর্ম-মত-তত্ত্বের দুনিয়ায় বাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। অর্থাৎ কোনো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব বা বিরূপতার বিরোধী বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট।